শেষ চৌকাঠ (পর্ব-৪)

শেষ চৌকাঠ - পর্ব ৪: ভাইবোনদের স্বপ্ন ও আত্মত্যাগ | নাহিদ আমিন
পড়াশোনায় ব্যস্ত ছোট ভাইবোন ও দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বড় ভাই

শেষ চৌকাঠ

লেখক: নাহিদ আমিন
পর্ব–৪

ভাইবোনদের স্বপ্ন ও আত্মত্যাগ

"যে বটবৃক্ষ নিজে রোদ-বৃষ্টি সয়ে ছোট চারাগাছগুলোকে ছায়া দেয়, ঝড় শেষে দেখা যায় তার নিজের ছাল-বাকল আর কিছুই অবশিষ্ট নেই..."

সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। আশুলিয়ার বস্তির পলিথিন ছেঁড়া আলো-আঁধারিতে দেখতে দেখতে দশটি বছর কেটে গেল। বারো বছরের সেই রোগা গ্রিজমাখা বালক আরাফ এখন বাইশ বছরের এক শক্তপোক্ত যুবক। রিকশা গ্যারেজের মেকানিক থেকে সে এখন লোকাল বাসের পোক্ত ড্রাইভার। স্টিয়ারিং হুইলে তার দুটো হাত যখন শক্ত হয়ে বসে, তখন তার চোখে থাকে পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার এক অবিচল বিশ্বাস। কিন্তু বয়সে যুবকে পরিণত হলেও আরাফের ব্যক্তিগত বলতে কোনো জীবন ছিল না। তার পরনের নীল রঙের শার্টটার কলার ক্ষয়ে গেছে, পায়ের একজোড়া চটি জুতো বারবার সেলাই করে পরা। নিজের দিকে তাকানোর কোনো অবসর বা ইচ্ছা—কোনোটাই তার ছিল না। কারণ তার জীবনের একমাত্র মন্ত্র হয়ে উঠেছিল ভাইবোনদের মানুষ করা। পঙ্গু বাবা জয়নাল আর অসুস্থ মা সখিনার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে আরাফ শপথ নিয়েছিল, সে নিজে না খেয়ে থাকলেও তার ছোট ভাইবোনদের গায়ে দারিদ্র্যের আঁচ লাগতে দেবে না।

ছোট ভাই আয়াস ছিল অত্যন্ত মেধাবী। তার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। যেদিন সরকারি মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার ফল বের হলো এবং আয়াস মেধা তালিকায় স্থান পেল, সেদিন জয়নালের সেই ছোট টিনের ঘরটায় আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। কিন্তু সেই আনন্দের আলো নিভে যেতে এক মুহূর্ত সময় লাগল না, যখন ভর্তির ফি, হোস্টেল খরচ আর মোটা মোটা বই কেনার মোটা অংকের টাকার হিসেব সামনে এলো। অত টাকা ওই পরিবারে কল্পনা করাও পাপ ছিল। আয়াস যখন ফিসফিস করে বলল, "ভাইয়া, আমার ভর্তি হওয়ার দরকার নেই, আমি কোনো সরকারি কলেজে সাধারণ ডিগ্রি পাস করে কোনো কাজ খুঁজে নিই," তখন আরাফ দাঁড়িয়ে উঠে আয়াসের কাঁধে হাত রাখল। আরাফের চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছিল, গলার স্বর কেঁপে উঠেছিল ধিক্কারে। "তুই ডাক্তার হবি আয়াস! তুই মানুষের প্রাণ বাঁচাবি। টাকা কোথায় পাব না পাব—সেটা আমার চিন্তা, তোর না।"

সেই রাতেই আরাফ বের হয়ে গেল টাকার খোঁজে। সুদের মহাজন মহসিন মিয়ার কাছে গিয়ে নিজের জীবনের সমস্ত স্বাধীনতা বন্দক রাখল। নিজের রক্ত জল করা আগামী পাঁচ বছরের ড্রাইভিংয়ের রোজগার আর মহাজনের চড়া সুদ—সব কিছুর বিনিময়ে সে একসাথে পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় করল। তার পরের মাসে মেজ ভাই আনাস যখন বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখল, বলল সৌদিতে একটা ভিসার সুযোগ এসেছে, সেখানে যেতে পারলে পরিবারের দুঃখ ঘুচবে—তখন আরাফ বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। গ্যারেজের মালিক কালাম ভাইয়ের কাছে নিজের শেষ সম্বল বলতে বাসের নাইট শিফটের অতিরিক্ত ডিউটি লিখে দিয়ে আরও এক লাখ টাকা ঋণ নিল। ছোট ভাই আকবর পলিটেকনিকে ভর্তি হতে চাইলে তার সেমিস্টারের ফি, ফুলি ও কল্পনার পরাশোনার খরচ—সবকিছু একাই টেনে চলল আরাফ। কোনো এক জাদুকরের মতো সে সময়মতো সবার হাতে হাতখরচ ও টিউশন ফি তুলে দিত, অথচ কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি এই টাকার বিনিময়ে তাকে প্রতিদিন আঠারো ঘণ্টা ড্রাইভিং সিটে বসে কাটাত হতো।

"নিজের স্বপ্নকে খুন করে অন্যদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার নামই তো বড় ভাই। সেই খুনের কোনো মামলা হয় না, কোনো বিচার হয় না; থাকে শুধু নীরব এক ইতিহাসের নিরব সাক্ষী।"

আরাফের স্টিয়ারিং ঘোরানো হাত দুটোর রগ ফুলে উঠত। রাতে চোখের নিচে ঘন কালি জমা হতো, কিন্তু ছোট ভাইবোনদের কোনো চাহিদা সে অসম্পূর্ণ রাখত না। আয়াস যখন ঢাকায় মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে থাকত, প্রতি মাসে আরাফ নিজে গিয়ে তাকে টাকা দিয়ে আসত। আয়াস তখন ভালো জামাকাপড় পরা শুরু করেছে, ডাক্তার বন্ধুদের সাথে তার মেলামেশা। বড় ভাই ড্রাইভার আরাফ যখন বাস থেকে নেমে ধুলোবালি মাখা গায়ে আয়াসের হোস্টেলের সামনে গিয়ে দাঁড়াত, আয়াস কেমন যেন ইতস্তত করত। বন্ধুদের সামনে ড্রাইভার ভাইকে পরিচয় দিতে তার অহংকারে বাধত। আয়াস বলত, "ভাইয়া, তুমি এত দূর কষ্ট করে কেন আসতে গেলে? টাকাটা বিকাশ করে দিলেই তো পারতে।" আরাফ ছোট ভাইয়ের চোখের সেই সামান্য সংকোচ ও অস্বস্তি বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করত। সে শুধু মলিন এক হাসি হেসে বলত, "তোরে একটু দেখতে মন চাইল রে আয়াস... নে, টাকাটা রাখ। ঠিকমতো খাইস।" আরাফের বুকের ভেতর একটা সূক্ষ্ম খাঁ খাঁ কষ্ট মোচড় দিয়ে উঠত, কিন্তু সে সেই কষ্টকে পকেটে চেপে রাখত।

বাড়িতে উমর, আকবর, কল্পনা আর সেলিনাও বড় হচ্ছিল। প্রতিটি ভাইবোনের নিজস্ব স্বপ্ন, দাবি আর প্রত্যাশার পাহাড় দিন দিন উঁচু হচ্ছিল। আকবরের পলিটেকনিকের প্রজেক্টের টাকা না দিলে সে রেগে ভাত খাওয়া বন্ধ করে দিত, আনাস সৌদি থেকে ফোন করে অতিরিক্ত আকামার টাকার জন্য তাগাদা দিত, ফুলি আর কল্পনার বিয়ের জন্য সখিনা কান্নাকাটি করত। এই সবার সব দাবি মেটানোর একমাত্র আধার ছিল সেই একজন মানুষ—আরাফ। সে নিজের বিয়ে, নিজের ভবিষ্যত, নিজের কোনো শখ—কোনো কিছুর কথা চিন্তা করার সুযোগ পায়নি। তার সহকর্মী ড্রাইভার রাজ্জাক তাকে একদিন বলেছিল, "আরাফ, তুই তো নিজের জোয়ান বয়সটা শেষ কইরা দিলি রে! নিজের জন্য কিছু করবি না? ভাইবোনরা কি কাল তোরে মনে রাখব?" আরাফ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে শান্ত গলায় বলেছিল, "ভাইবোনরা ভালো থাকলেই আমি ভালো রাজ্জাক ভাই। আমি তোদের মতো সুখী হইতে আসি নাই, ওদের সুখী করতেই আমার জন্ম।"

আরাফের এই অতিরিক্ত খাটুনি আর অনাহারে-অনিদ্রায় দিন কাটানোর ফলে তার শরীরে ভেতরে ভেতরে ঘুণপোকা ধরতে শুরু করেছিল। প্রায়ই তার বুকে এক তীব্র ব্যথা উঠত, মাথা ঘুরে উঠত স্টিয়ারিং ধরে থাকা অবস্থাতেই। কিন্তু সে কাউকেই কিছু জানতে দিত না। সখিনা মা হয়ে ছেলের চেহারার এই ফ্যাকাশে ভাব দেখে মাঝে মাঝে বুক চাপড়ে কাঁদত। "আরাফ, তুই একটু জিরো বাপ! কত খাটবি আর?" আরাফ মায়ের কোলে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলত, "আর একটু মা... আয়াসটা ডাক্তার হইয়া বের হোক, আনাসটা বিদেশে সেটেল হোক, আকবরের চাকরিটা হোক... তারপর আমি সারাদিন ঘুমামু।" আরাফ জানত না, সে যে ভাইবোনদের জন্য নিজের জীবন নিংড়ে মেধার প্রদীপ জ্বালাচ্ছে, সেই প্রদীপের আলো যখন তীব্র হবে, তখন সেই আলোর নিচে তার মতো মেকানিক আর ড্রাইভার বড় ভাইয়ের কোনো স্থান থাকবে না।

পাঠকের মনে প্রশ্ন?

ডাক্তার ভাই আয়াস, প্রবাসী আনাস আর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার আকবর কি সত্যিই বড় ভাই আরাফের এই রক্তজল করা ত্যাগের মূল্য দেবে? নাকি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর তারা লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নেবে এই নিঃস্ব ড্রাইভার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ