শেষ চৌকাঠ (পর্ব-৫)

শেষ চৌকাঠ - পর্ব ৫: নতুন বন্ধন ও জীবনযুদ্ধ | নাহিদ আমিন
এক টুকরো আলো ও শান্ত গৃহকোণের ছবি

শেষ চৌকাঠ

লেখক: নাহিদ আমিন
পর্ব–৫

নতুন বন্ধন ও জীবনযুদ্ধ

"তপ্ত মরুর বুকে এক ফোঁটা বৃষ্টির মতো কিছু মানুষ আসে, যারা নিজের কষ্ট দিয়ে হলেও অন্য কারো ক্ষতবিক্ষত হৃদয়কে শান্ত করতে জানে..."

আরাফের বয়স যখন তিরিশ ছুঁইছুঁই, তখনো সে বিয়ের কথা চিন্তা করার দুঃসাহস দেখায়নি। মেজ ভাই আনাস ততদিনে সৌদিতে ভালো কাজ পেয়ে গেছে, আয়াসের মেডিকেলের শেষ বর্ষের ইন্টার্নশিপ চলছে, আকবরও চাকরির সন্ধান করছে। ঘরে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সখিনা এবার শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন। সখিনা অনুধাবন করতে পারলেন, যে ছেলেটি ষোলটি বছর নিজের জীবনের সমস্ত ইচ্ছে-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে পুরো পরিবারকে পলিথিনের খাঁচা থেকে ইটের ঘরে এনে তুলেছে, তার জন্য ঘরে একজন সমবেদী সঙ্গী দরকার। গ্রাম থেকে অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক সাধারণ, শান্ত স্বভাবের মেয়ে রিজিয়াকে আনা হলো আরাফের বউ করে। রিজিয়ার বাবা ছিলেন গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক; অভাব কী জিনিস তা সে জন্ম থেকেই দেখে এসেছে। বিয়ের রাতে লাল সুতির শাড়িতে রিজিয়া যখন সেই টিনের ঘরের চৌকাঠে পা দিল, তখন আরাফের হাত দুটো লজ্জায় ও দ্বিধায় কাঁপছিল।

বাসর রাতে আরাফ কোনো মিষ্টি বা দামি উপহার নিয়ে রিজিয়ার সামনে দাঁড়াতে পারেনি। সে রিজিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার ড্রাইভিংয়ের ঘাম মাখা হাত দুটো দেখিয়ে খুব শান্ত গলায় বলেছিল, "রিজি, আমি কোনো বড় সাহেব না। সারা দিন বাসের স্টিয়ারিং ঘুরাইয়া আমার এই হাত রক্তে রাঙা হয়। ঘরে পঙ্গু বাবা, অসুস্থ মা আর অনেকগুলো ভাইবোনের পড়াশোনার দায়। আমি তোমায় সোনার গয়না দিতে পারুম না, শুধু রক্ত জল করা উপার্জনের সৎ এক টুকরা রুটি দিমু। তুমি কি আমার এই চালচুলোহীন সংসারে থাকতে পারবা?" রিজিয়া আরাফের সেই খসখসে, কড়া পড়া শক্ত হাত দুটি নিজের দুহাতে তুলে নিয়েছিল। সে কোনো কথা না বলে শুধু চোখের কোণ দিয়ে জল ফেলে মাথা নেড়েছিল। সে বুঝেছিল, এই পুরুষটি কোনো ছলনাময়ী মিথ্যে আশ্বাস দেয়নি; সে এক পর্বতসম সত্য, যার ছায়ায় যেকোনো নারী সারা জীবন নিরাপদে কাটিয়ে দিতে পারে।

রিজিয়ার আগমনের পর যৌথ সংসারের টানাপোড়েন যেন এক নতুন রূপ নিল। আরাফের ভাইবোনেরা ততদিনে শহরের নানা আলোয় অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল। সখিনা ও জয়নালের সেবার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল রিজিয়া। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সে রান্নাঘরে ধোঁয়ার মধ্যে বসে সংসারের ছাইপাঁশ সামলাত, শাশুড়ির পা টিপে দিত, শ্বশুরকে সময়মতো ওষুধ খাইয়ে দিত। কিন্তু তবুও যেন ভাইবোনদের চোখে সে ছিল কেবল এক 'অশিক্ষিত ড্রাইভারের বউ'। আয়াস যখন ঢাকা থেকে বাড়ি আসত, রিজিয়া তার জন্য কত যত্ন করে পিঠা বানাত, অথচ আয়াস রিজিয়ার টেবিল ম্যানার বা সাধারণ আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে আড়ালে তাচ্ছিল্য করত। রিজিয়া সব বুঝতে পারত, কিন্তু সে কোনোদিন আরাফকে একটি অভিযোগও জানায়নি। সে জানত, আরাফ সারাদিন রোদে পুড়ে যে মানসিক চাপ নিয়ে ঘরে ফেরে, সেখানে তার কোনো পারিবারিক অশান্তির কথা বলা মানে লোকটার বুকে আরও একটা পেরেক মারা।

"যে নারী স্বামীর দারিদ্র্যকে লজ্জা না ভেবে তার নীরব আত্মত্যাগকে সম্মান করতে জানে, সেই নারীই একটা ভাঙা ঘরকে ঈর্ষাতীত স্বর্গে পরিণত করতে পারে।"

বিয়ের বছর দুয়েকের মাথায় আরাফ ও রিজিয়ার জীবনে প্রথম আলোর মুখ হয়ে এলো তাদের কন্যা সন্তান—শ্রাবণী। মেয়ের ফুটফুটে মুখটা যখন প্রথমবার আরাফ নিজের হাতে নিল, সেদিন বাসের স্টিয়ারিংয়ে আঠারো ঘণ্টা খাটুনির সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে উবে গেল। তার কয়েক বছর পর জন্ম নিল ছেলে আলিফ। শ্রাবণী আর আলিফ—এই দুটো কচি মুখ যেন আরাফের জীবনের সমস্ত অন্ধকারকে ধুয়ে-মুছে দিতে এলো। আরাফ এখন রাতে বাড়ি ফিরে আর নিজের কষ্টগুলোর কথা ভাবে না; সে এক কোণে বসে শ্রাবণীর আধো-আধো কথা শোনে, আলিফকে কোলে নিয়ে ঘরের মধ্যে গোল হয়ে ঘোরে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও ভেতরের সত্যিটা ছিল নির্মম—আরাফের উপার্জনের একটা বড় অংশই তখনও চলে যাচ্ছিল আনাসের বিদেশ যাত্রার বাকি ঋণ শোধ করতে, আর আকবরের খরচে। রিজিয়া নিজের জন্য একটা নতুন শাড়ি কেনার টাকাও পেত না, সন্তানের দুধের পুষ্টি সামলাতে তাকে নিজের খাবার থেকে কাটছাঁট করতে হতো।

আলিফ ও শ্রাবণী একটু একটু করে বড় হতে লাগল। শ্রাবণীর বুদ্ধিমত্তা দেখে বোঝা যেত সে বাবার চোখ পেয়েছে—শান্ত, সহনশীল অথচ দৃঢ়। আরাফ মাঝরাতে বাসের নাইট ট্রিপ সেরে বাড়ি ফিরে এসে দেখতে পেত রিজিয়া দুটো বাচ্চাকে বুকে চেপে ঘুমিয়ে আছে, টিনের চালে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। আরাফ ভাবত, তার জীবন তো শেষ হয়ে এলো; অন্তত নিজের এই দুটো সন্তানকে সে মানুষের মতো মানুষ করবে। কিন্তু সে জানত না, সে যে ভাইবোনদের মাথার ওপর ছাদ তৈরি করতে নিজের যৌবন, রক্ত আর সংসার বিসর্জন দিয়েছে—তারা আজ স্বাবলম্বী হওয়ার পর নিজেদের নতুন উচ্চতা থেকে এই 'অশিক্ষিত বাস ড্রাইভার' ভাই আর তার সন্তানদের কীভাবে দেখতে শুরু করেছে। মেঘ জমে উঠছিল সেই ছাদের কোণেই, যা খুব শীঘ্রই এক তছনছ করে দেওয়া ঝড়ে রূপ নিতে যাচ্ছিল।

পাঠকের মনে প্রশ্ন?

ডাক্তার আয়াস ও প্রকৌশলী আকবর কি আরাফের সন্তান শ্রাবণী ও আলিফকে নিজেদের পরিবারের অংশ হিসেবে মেনে নেবে? নাকি রিজিয়া ও তার সন্তানদের গ্রাস করবে অহংকার আর স্বার্থপরতার করুণ প্রতিক্রিয়া?

পরবর্তী পর্বে (পর্ব-৬) যা থাকছে...

আয়াসের রাজকীয় বিয়ে ও পরিবারে ধনকুবের শ্বশুরবাড়ির প্রবেশ। ধোপাদুরস্ত সমাজে ড্রাইভার বড় ভাইয়ের পরিচয় লুকিয়ে রাখা, সখিনা ও জয়নালের ওপর চরম অবহেলা এবং স্বার্থের টানে ভাইদের নিজেদের মধ্যে ভিটেমাটি বাঁটোয়ারার নির্মম ষড়যন্ত্র...

পরবর্তী পর্ব দেখতে ক্লিক করুন...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ