শেষ চৌকাঠ (পর্ব-৬)

শেষ চৌকাঠ - পর্ব ৬: অহংকার ও অবহেলা | নাহিদ আমিন
অভিজাত বিয়ের আলো ঝলমলে আলোকসজ্জা ও নীরব দূরত্ব

শেষ চৌকাঠ

লেখক: নাহিদ আমিন
পর্ব–৬

অহংকার ও অবহেলা

"মানুষ যখন উঁচুতে ওঠে, তখন সে ভুলেই যায়—যে সিঁড়ি বেয়ে সে ওপরে উঠেছে, সেই সিঁড়ির প্রতিটি ধাপেই কারো না কারো রক্ত আর ঘামের চিহ্ন লেখা ছিল..."

আয়াসের ডাক্তারি পড়া শেষ হওয়ার পর তার জন্য অভিজাত এক শিল্পপতি পরিবারের একমাত্র মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব এলো। ঢাকার এক ফাইভ স্টার হোটেলে যখন বিয়ের আয়োজন করা হলো, তখন পুরো অনুষ্ঠান সেজে উঠল হাজারো আলোর রোশনাইতে। গাড়ি ভর্তি করে স্বনামধন্য ডাক্তার, ব্যবসায়ী আর আমলারা আসতে লাগলেন। কিন্তু সেই চোখ ধাঁধানো আলো আর আভিজাত্যের মাঝে এক কোণে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়েছিলেন আরাফ ও তার পরিবার। সুতির সাধারণ একটা প্যান্ট আর আয়রন করা পুরানো শার্ট পরা আরাফ যখন ছোট ভাই আয়াসের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে চাইল, তখন আয়াস সূক্ষ্ম এক বিরক্তি নিয়ে তাকে আড়ালে টেনে নিয়ে বলল, "ভাইয়া, তুমি আর ভাবি স্টেজের পেছনে গিয়া বসো। শ্বশুরের তরফের অনেক বড় বড় গেস্ট আসতাছে, তোমাগো এই বেশে দেখলে ওরা কী ভাববো? বলবো ডাক্তার আয়াসের বড় ভাই বাস ড্রাইভার?"

আয়াসের সেই একটা মাত্র কথা যেন তপ্ত চাবুকের মতো আরাফের বুকের ঠিক মাঝখানটায় এসে লাগল। যে হাত দুটো দিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরে ঘুরে আয়াসের মেডিকেলের ফি যোগানো হয়েছে, আজ সেই হাত দুটোকেই আয়াসের অভিজাত শ্বশুরবাড়ির সামনে লজ্জার কারণ বলে মনে হলো। রিজিয়া দূর থেকে দৃশ্যটি দেখে চোখের জল চেপে আরাফের হাতের ওপর হাত রাখল। "চলুন, আমরা পেছনের টেবিলেই বসি।" আরাফ এক ফোঁটা চোখের জল পড়তে দিল না; সে শুধু মলিন হেসে বলল, "হাঁ রিজি, আয়াস তো ঠিকই বলছে। ওর স্ট্যাটাস এখন আলাদা।" সেই রাতে রাজকীয় ভোজ শেষে যখন সবাই হাসাহাসি করছিল, তখন আরাফ চুপচাপ এক কোণে বসে চিন্তা করছিল—যে ভাইকে সে পরম স্নেহে নিজের জীবনের বিনিময়ে গড়ে তুলেছে, সেই ভাই আজ তাকে নিজের বড় ভাই বলে পরিচয় দিতেও কুণ্ঠাবোধ করছে।

কয়েক বছরের মধ্যে আকবরও পলিটেকনিক শেষ করে নামকরা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে চাকরি পেয়ে গেল। আনাস সৌদি থেকে ফিরে এসে নিজের আলাদা ব্যবসা শুরু করল। ভাইদের অর্থ আর সামাজিক প্রতিপত্তি বাড়ার সাথে সাথে সংসারের মেজাজও দ্রুত বদলাতে শুরু করল। তারা আর সেই আশুলিয়ার মেস-বস্তির ইটের ঘরটাকে নিজের 'বাড়ি' বলে মানতে পারছিল না। ধানমন্ডি আর উত্তরা এলাকায় ভাইদের আধুনিক ফ্ল্যাট কেনা হলো। কিন্তু সেই বিশাল বিলাসবহুল ফ্ল্যাটগুলোতে পঙ্গু বাবা জয়নাল আর অসুস্থ মা সখিনার স্থান হলো না। আকবরের বউ স্পষ্ট জানিয়ে দিল, গ্রাম্য আর অসুস্থ শাশুড়ির সেবা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। আয়াস বলল, তার ফ্ল্যাটে মেডিকেল ডিরেক্টরদের যাতায়াত, সেখানে পঙ্গু বৃদ্ধ বাবার কাশির শব্দ আর হুইলচেয়ার মানায় না। ফলে জয়নাল ও সখিনা থেকে গেলেন সেই পুরোনো ইটের ঘরটাতেই—বড় ভাই আরাফ ও রিজিয়ার গলগ্রহ হয়ে।

"টাকার গরম মানুষকে শুধু ধনীই করে না, মাঝে মাঝে অন্ধও করে দেয়। তখন নিজের জন্মদাতা আর অন্নদাতাও ঘরের অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের মতো ভারী মনে হয়।"

রিজিয়া কোনোদিন জয়নাল বা সখিনাকে বোঝা মনে করেনি। সে নিজের দুটো বাচ্চা—শ্রাবণী ও আলিফকে সামলানোর পাশাপাশি শাশুড়ির ক্ষতের মলম লাগানো আর পঙ্গু শ্বশুরের হিসু-পায়খানার কাঁথা পরিষ্কার করত মুখে এক ফোঁটা বিরক্তি না এনে। কিন্তু যে ভাইরা মাসে লাখ টাকা আয় করত, তারা অসুস্থ মা-বাবার ওষুধের খরচের জন্য এক হাজার টাকা পাঠাতে গেলেও হাজারটা বাহানা দাঁড় করাত। আনাস ফোন করে বলত, "আমার প্রজেক্টে অনেক টাকা আটকে আছে, এবার ওষুধের টাকাটা বড় ভাই দিক।" অথচ বড় ভাই আরাফ তখনও দিন-রাত নাইট ট্রিপ মেরে, বুক ব্যথার ওষুধ গিলে বাসের স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরে রাখত কেবল সংসারের বাজার আর মা-বাবার ওষুধের কেমোথেরাপির বিল মেটানোর জন্য। প্রতিষ্ঠিত ভাইরা আরাফের সন্তানদেরও সহ্য করতে পারত না; শ্রাবণী ও আলিফ যখন চাচাদের সুসজ্জিত ঘরে যেত, তাদের বলা হতো জিনিসপত্রে হাত না দিতে—কারণ তারা নাকি অশিক্ষিত ড্রাইভারের বাচ্চা, সব নোংরা করে ফেলবে।

অহংকারের চরম পরাকাষ্ঠা ঘটল যখন ভাইরা একদিন হঠাৎ পুরোনো বাড়িতে এক হয়ে হাজির হলো। জয়নাল ও সখিনা তখনও বেঁচে, কিন্তু তিন প্রতিষ্ঠিত ভাইদের আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাবার নামে থাকা গ্রামের সেই সামান্য ভিটেমাটি আর আশুলিয়ার পুরোনো জমিটুকু নিজেদের নামে লিখে নেওয়া। আয়াস ঠান্ডা গলায় বলল, "বড় ভাই তো সারাজীবন ড্রাইভারিই করল, জমি জমা সামলানোর যোগ্যতা ওর নাই। আমরা এগুলা বিক্রি কইরা নতুন প্রজেক্টে ইনভেস্ট করুম।" যে আরাফ নিজের যৌবন বিক্রি করে ভাইদের মানুষ করার জন্য ঋণগ্রস্ত হয়েছিল, আজ সেই ভাইরাই তাকে অযোগ্য বলে অপমান করে বাবার শেষ সম্বল টুকু কেড়ে নিতে চাইছে। পঙ্গু জয়নাল থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে হুইলচেয়ার থেকে চিৎকার করে ওঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কথা ফোটার আগেই তাঁর মুখ দিয়ে কেবল অস্পষ্ট আর্তনাদ বের হলো।

আরাফ ঘরের এক কোণে নীরবে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখ দুটো ছিল রক্তজবার মতো লাল, বুকের ভেতরটা অভিমানে ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছিল। সে কোনো চিৎকার করল না, ঝগড়া করল না। সে শুধু শান্ত পায়ে হেঁটে এসে জয়নালের হুইলচেয়ারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। ভাইদের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বলল, "তোরা যা চাস নিয়া যা আয়াস... জমি, ভিটেমাটি, যা আছে সব তোদের নামে লিখে দিমু। শুধু আমার বাবা-মাকে তোদের অহংকারের বাজারে বিক্রি করিস না। ওদের আমার কাছে ছেড়ে দে, আমি বাসের স্টিয়ারিং ঘুরিয়েই ওদের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভাত খাওয়াতে পারুম।" সেই রাতে আরাফ বুঝতে পারল, রক্ত দিয়ে যে বাঁধন সে তৈরি করেছিল, স্বার্থ আর অহংকারের ঝড়ে সেই বন্ধন আজ চিরতরে চুরমার হয়ে গেছে।

পাঠকের মনে প্রশ্ন?

ভিটেমাটি ও সম্পত্তি হারিয়ে আরাফ কি পারবে পঙ্গু বাবা-মা আর নিজের সন্তানদের নিয়ে টিকে থাকতে? বাসের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে কত দিন সে টেনে নিয়ে যাবে অসুস্থ শরীর আর এই চরম অভাবের সংসার? নাকি সামনে আসছে আরও কোনো নির্মম ট্র্যাজেডি?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ