শেষ রাতের ডাক

শেষ রাতের ডাক - নাহিদ আমিন

শেষ রাতের ডাক

বর্ষার মৌসুমের শেষ দিকে এক অন্ধকার রাত। আকাশজুড়ে কালো মেঘের, ঘনঘটা দূরে দূরে বিদ্যুতের ঝলকানি, হালকা মেঘের গর্জন আর চারদিকে অন্ধকারের নীরবতা যেন পৃথিবীর সব শব্দ কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অর্ণব ছুটি কাটাতে তার দাদার পুরোনো গ্রামের বাড়ি দাপুনিয়ার বাজারের পাশে গোষ্টা গ্রামে এসেছিল। বাড়িটি ছিল প্রায় একশো বছরের পুরোনো—মোটা দেয়াল, কাঠের দরজা, লম্বা বারান্দা আর উঠানের এককোণে বিশাল এক বটগাছ। আশেপাশে বিভিন্ন বড় বড় গাছের সারি সারি। গ্রামে আসার পর থেকেই সবাই তাকে একটাই কথা বলছিল, “রাত বারোটার পরে কখনো বটগাছের দিকে তাকানো যাবে না।” অর্ণব এসব কুসংস্কার বিশ্বাস করতো না। সে হাসতে হাসতেই কথাগুলো উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু প্রথম রাতেই হঠাৎ করে ঠিক বারোটার সময় তার ঘুম ভেঙে গেল। জানালার বাইরে অন্ধকার নিবি নিবি আলোতে যেন কেউ খুব আস্তে আস্তে তার নাম ধরে ডাকছে—“অর্ণব... অর্ণব...”। প্রথমে সে ভাবল, হয়তো গ্রামের কোনো মানুষ। কিন্তু জানালার কাছে গিয়ে বাইরের দিকে তাকাতেই দেখল বটগাছের নিচে সাদা কাপড় পরা এক অচেনা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। অর্ণব বাহিরে টর্চ লাইট ধরতেই সেই মানুষটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। পরদিন সকালে অর্ণব সেই ঘটনাটি দাদাকে বলতেই দাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “যদি আবার ডাক শুনতে পাও, কোনোভাবেই বাইরে যাবে না। কারণ এই ডাক যারা অনুসরণ করেছে, তারা আর কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।ফিরে আসেনি।”

অর্ণবের কৌতূহল দিন দিন আরও বাড়তে লাগল। গ্রামের বায়ু জ্যৈষ্ঠ প্রবীণদের কাছে জানতে পারল, বহু বছর আগে এই বাড়ি দক্ষিণ পাশে একটি ছোট জমিদারবাড়ি ছিল। এক ঝড়ের রাতে সেখানে ভয়াবহ আগুন লাগে। সেই আগুনে পুরো জমিদার বাড়ির পরিবারে সব লোক মারা যায়, কিন্তু পরিবারের একমাত্র ছোট মেয়েটির লাশ কখনো পাওয়া যায়নি। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, সেই মেয়েটির আত্মা এখনো এখনো ঘুরে বেড়ায় কাউকে খুঁজে বেড়ায়। রাতে সে মানুষের নাম ধরে ডাকে, আর কেউ যদি তার পিছু নেয়, তাহলে সে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। অর্ণব এসব গল্প শুনে ভয় পেলেও রহস্যের শেষ দেখতে চাইছিল। অর্ণব তাই তৃতীয় রাতে তার মোবাইলের ক্যামেরা চালু রেখে জানালার পাশে অপেক্ষা করতে লাগে। রাত ঠিক বারোটা বাজতেই আবার সেই ডাক শোনা যায়। এবার শুধু ডাক নয়, ডাকের সাথে হালকা আর্তনাদের শব্দ ও দূরে মৃদু আলোও দেখা যাচ্ছিল। আলোটি ধীরে ধীরে বটগাছের চারপাশে ঘুরছিল। অর্ণব সাহস করে ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করতে লাগে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, মোবাইলের স্ক্রিনে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। অথচ নিজের চোখে সে স্পষ্ট দেখতে দেখতে পাচ্ছিল গ্রামের প্রবীনদের কাছ থেকে শোনা সাদা পোশাকের একটি ছোট মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। সেই হাসির মধ্যে এমন এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল যে, অর্ণবের ইচ্ছা হচ্ছিল দরজা খুলে তার কাছে চলে যেতে।

ঠিক সেই সময় দাদার কথা তার মনে পড়ে গেল। সে নিজেকে সামলে নিল। কিন্তু দরজার বাইরে হঠাৎ করেই কারও হাঁটার শব্দ শোনা গেল। হঠাৎ দরজার কাছে কারো হাঁটার শব্দ শুনে অর্ণবের কিছুটা ভয় করতে শুরু করলো। শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসতে লাগল। তারপর দরজায় তিনবার টোকা পড়ল—ঠক... ঠক... ঠক...। অর্ণব ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল, “কে?” বাইরে থেকে খুব পরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এল—“আমি দাদা, দরজা খোল।” কিন্তু অর্ণবের মনে পড়ল, দাদা তো অন্য ঘরে ঘুমিয়ে আছেন। সে দরজা খুলল না। কয়েক সেকেন্ড পর পাশের ঘর থেকে সত্যিকারের দাদার চিৎকার শোনা গেল, “অর্ণব, কোনোভাবেই দরজা খুলবি না!” মুহূর্তের মধ্যে দরজার বাইরে দাঁড়ানো কণ্ঠটি বদলে গেল। এবার সেটা বিকট হাসিতে পরিণত হলো। পুরো বাড়ি যেন সেই হাসিতে কেঁপে উঠল। জানালার কাঁচে হঠাৎ অসংখ্য ছোট ছোট হাতের ছাপ আচড় ফুটে উঠল। অর্ণব ভয়ে চোখ বন্ধ করে কোরআনের আয়াত পড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর সবকিছু আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ভোর হলে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে সে দেখল, দরজার সামনে ভেজা কাদার ওপর ছোট্ট পায়ের ছাপ দূরের জঙ্গলের দিকে চলে গেছে।

অর্ণব সিদ্ধান্ত নিল রহস্যের শেষ না দেখে সে ফিরবে না। পরদিন গ্রামের এক বৃদ্ধ ইমামের সাহায্য নিয়ে এবং গ্রামের আরো কিছু লোকজন নিয়ে সে পুরোনো জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি ভাঙা কুয়োর পাশে মরিচা ধরা লোহার পুরোনো ছোট বাক্স পাওয়া গেল। বাক্সের ভেতরে ছিল একটি পুরোনো ডায়েরি, একটি রুপার লকেট এবং একটি শিশুর ছবি এবং শিশুদের কিছু খেলনা । ডায়েরি পড়ে জানা গেল, আগুনের রাতে ছোট মেয়েটি মারা যায়নি। কিছু লোভী লোক তাকে অপহরণ করে এই জঙ্গলে এনে হত্যা করেছিল। এলাকার লোকজন সারাজীবন ভেবেছিল সে আগুনে পুড়ে মারা গেছে। সত্যিটা কেউ জানত না। সেই অজানা মৃত্যুর কষ্ট আর ন্যায়বিচার না পাওয়ার যন্ত্রণাই যেন তার আত্মাকে আটকে রেখেছিল। গ্রামের মানুষ ইমামের পরামর্শে মেয়েটির জন্য দোয়া করল এবং লকেটটি সহ আরও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র তার পরিবারের পুরোনো কবরের পাশে দাফন করে দিল। সেদিন রাতের পর প্রথমবারের মতো বটগাছের নিচে আর কোনো সাদা ছায়া দেখা গেল না। গ্রামের মানুষও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সবাই মনে করল, বহু বছরের অভিশাপ অবশেষে শেষ হয়েছে।

কয়েকদিন পর অর্ণব পুনরায় শহরে ফিরে এল। জীবন আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেল। কিন্তু এক রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে বসে সে পুরোনো ভিডিওগুলো দেখতে লাগল। সেই ভিডিওতে যেখানে কিছুই থাকার কথা নয়, সেখানে হঠাৎ এক ফ্রেমের জন্য সাদা পোশাক পরা ছোট্ট মেয়েটিকে দেখা গেল অর্ণব প্রথমে হয়তো ভাবছিল এটা তার মতিভ্র কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়েটির মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখে আগের মতো ভয়ংকর হাসি নেই; বরং ছিল শান্ত একটি হাসি। অর্ণব ভাবল, হয়তো সব সত্যিই শেষ হয়ে গেছে। ঠিক তখনই তার মোবাইলে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল। সেখানে শুধু একটি বাক্য লেখা—“ধন্যবাদ... কিন্তু আমি একা ছিলাম না।” বার্তাটি পড়তেই স্ক্রিন নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। আবার চালু হতেই সেই বার্তার কোনো অস্তিত্ব রইল না। অর্ণব ধীরে ধীরে মাথা তুলে জানালার বাইরে তাকাল। দূরের অন্ধকারে যেন আরেকটি ছায়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এবার সে কাউকে ডাকল না, শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। কারণ সে বুঝে গেছে, পৃথিবীর সব রহস্যের শেষ হয় না—কিছু রহস্য শুধু নতুন আরেকটি গল্পের শুরু করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ