বাবার স্বর্ণপদক
শীতের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। ভোর পাঁচটার আগেই ঘুম ভেঙে যায় আব্দুল মালেকের। বয়স প্রায় ষাট ছুঁইছুঁই, তবুও প্রতিদিনের মতো আজও সকালে ফজরের নামাজ পড়ে রিকশা নিয়ে বের হয়ে যায়। অভাবে টানা পোড়েন সংসার। সংসারে তিনি, স্ত্রী আর একমাত্র ছেলে রায়হান। ছেলেটা কলেজে পড়ে। মালেক সাহেবের স্বপ্ন—তিনি না পারলেও তাঁর ছেলে একদিন বড় মানুষ হবে।
প্রতিদিন শহরের অলিগলি ঘুরে রিকশা চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে। সংসারে লোকজন বেশি না থাকলে কি হবে, ছেলে বড় হচ্ছে তাই দিন দিন সংসারের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক দিন এমনও গেছে, তিনি দুপুরে শুধু পানি খেয়ে কাটিয়েছেন, যাতে ছেলের জন্য ভালো খাবার কিনে নিতে পারেন। রায়হান এসব জানত না। বাবা ছেলেকে কখনো বুঝতেও দেননি।
কলেজে পরীক্ষায় রায়হান ভালো ফল করেছিল। সবাই বলেছিল, "ছেলেটার অনেক দূর যাওয়ার ক্ষমতা আছে।" কিন্তু পড়াশোনার খরচ ছিল বড় চিন্তা। পরীক্ষা ফি, বই, হোস্টেল, যাতায়াত—সব মিলিয়ে এমন এক অঙ্ক, যা মালেক সাহেবের কাছে পাহাড়ের মতো মনে হচ্ছিল।
তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। স্ত্রীর শেষ সোনার নাকফুল বিক্রি করলেন। নিজের বহু বছরের সঞ্চয় ভেঙে দিলেন। রাতে অতিরিক্ত সময় রিকশা চালানো শুরু করলেন। মালেক সাহেব রক্ত বিক্রি করে হলেও ছেলের পড়াশোনা চালাবেন।
রায়হান মাঝে মাঝে বলত, "বাবা, এত কষ্ট করো না। আমি পড়াশোনা ছেড়ে কাজ করব।" মালেক সাহেব হেসে উত্তর দিতেন, "আমি সারাজীবন প্যাডেল মেরেছি, মানুষের বকা খেয়েছি, মানুষের মালামাল নিজের কাঁধে বহন করে নিয়ে গিয়েছি। আমি বেঁচে থাকতে আমার ছেলে যেন এরকম কষ্ট করতে না হয় সেজন্য তোকে পড়াশোনা করাচ্ছি। তুই যেন কলম ধরতে পারিস—এইটাই আমার স্বপ্ন।"
বছর ঘুরতে লাগল। রায়হান পড়াশোনায় আরও ভালো করতে লাগল। রায়হান এখন কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেছে। শিক্ষকেরা তার পড়াশোনা দেখে গর্ব করেন এবং তাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু বাবার শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল। হাঁপানি বেড়ে গিয়েছিল। তবুও তিনি বিশ্রাম নিতেন না। মালেক সাহেবের মাথায় একটা চিন্তা ঘুরতো কিভাবে আমার ছেলেকে মানুষের মত মানুষ করা যায়। আমি যত অন্যায় অত্যাচার মানুষের কাছে সহ্য করেছি আমার ছেলে যেন তা না করতে হয়।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে যাত্রী নামিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ রাস্তার পাশে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। পথচারীরা হাসপাতালে নিয়ে গেলেও জ্ঞান ফিরল না। খবর পেয়ে রায়হান সহ মালেক সাহেবের স্ত্রী ছুটে গেলেন হাসপাতালে।
রায়হান বাবার বিছানার পাশে বসতেই মালেক সাহেব কষ্ট করে চোখ খুললেন। তখন মালেক সাহেবের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। রায়হান কাঁদো কাঁদো গলায় বাবাকে বললেন, "বাবা তোমার কিচ্ছু হবে না।"
মালেক সাহেব কাঁপা হাতে শার্টের পকেট থেকে একটি পুরোনো খাম বের করে ছেলের হাতে দিলেন। বললেন, "এটা... তোর জন্য..."
এরপর আর কোনো কথা বলতে পারলেন না, সেদিনই তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
দাফনের পর কয়েক দিন পর্যন্ত রায়হান খামটি খুলতে পারেনি। মনে হচ্ছিল, খুললেই বাবাকে সত্যিই হারানোর কথা মেনে নিতে হবে। এক রাতে সাহস করে খামটি খুলল। ভেতরে ছিল কিছু টাকা, একটি ব্যাংকের জমার রসিদ এবং ছোট্ট একটি চিঠি।
আমি জানি, এই টাকা খুব বেশি না। কিন্তু আমি যত দিন বেঁচে ছিলাম, প্রতিদিন একটু একটু করে তোর ভবিষ্যতের জন্য জমিয়েছি। যদি কোনো দিন আমি না থাকি, তাহলে এই টাকা দিয়ে পড়াশোনা শেষ করিস। মানুষের মতো মানুষ হবি।
আর একটা কথা মনে রাখিস—গরিব হওয়া লজ্জার নয়। অসৎ হওয়াটাই লজ্জার।
চিঠি পড়ে রায়হান প্রথমবারের মতো চিৎকার দিয়ে মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি করে কাঁদতে লাগল।
সে বুঝতে পারল, বাবা কখনো নিজের জন্য কিছু কেনেননি। যে পুরোনো ছেঁড়া সোয়েটারটি তিনি বছরের পর বছর পরেছেন, সেটি নতুন কেনার টাকাও জমিয়েছিলেন ছেলের ভবিষ্যতের জন্য।
সেই দিন থেকেই রায়হান নতুন করে জীবন শুরু করল। রায়হান এর পর আর কোনদিন নতুন কাপড় কেনেননি। দেওয়া কাপড় পরে বাবার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে পুরোদমে পড়াশোনা শুরু করলেন। রায়হান প্রতিজ্ঞা করলেন বাবার স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আর কখনো নতুন কাপড় পরবেন না।
পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করত। রাত জেগে পড়ত। বাবার চিঠিটি সব সময় ব্যাগে রাখত। সন্ধ্যার পর চিঠিটা বুক সেলফের উপর ঝুলিয়ে রাখত যেন সেই চিঠি দেখে বাবার প্রতিজ্ঞার কথা মনে করতে পারে।
পাঁচ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে সে স্বর্ণপদক পেল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সবাই যখন হাততালি দিচ্ছিল, তখন তার চোখ শুধু দর্শকসারির খালি একটি চেয়ারের দিকে চলে যাচ্ছিল। সেখানে কেউ বসে ছিল না। কিন্তু রায়হানের মনে হচ্ছিল, তাঁর বাবা ঠিক সেখানেই বসে আছেন—মুখভরা হাসি নিয়ে। রায়হান সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন :-
"আমি রায়হান আমার পড়াশোনাটা সহজ পরিস্থিতিতে ছিল না আমার বাবা একজন রিকশাচালক। তিনি আবারও রিপিট করলেন হ্যাঁ আপনারা ঠিকই শুনছেন আমার বাবা একজন রিকশাচালক। রিকশাচালক বাবার একমাত্র ছেলে আমি আমি অনেক কষ্ট এবং অনেক কিছু ত্যাগ দিয়ে বাবাকে হারিয়ে আজকের এই অবস্থায় এসেছি। সকলে আমার জন্য দোয়া করবেন আমি যেন ভবিষ্যতে বড় কিছু হতে পারি, দেশের জন্য কাজ করতে পারি এবং বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি।"
সমাবর্তন শেষে সে সরাসরি বাবার কবরের কাছে গেল। স্বর্ণপদকটি কবরের পাশে রেখে আস্তে করে বলল—
"বাবা... তুমি বলেছিলে কলম ধরতে। আজ তোমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এই পদক আমার নয়... এটা তোমার।"
"আমি তো জানতাম, তুই পারবি।"


0 মন্তব্যসমূহ
কেমন লাগলো বা আপনার মতামত কমেন্ট করে জানান। গঠনমূলক যেকোনো মন্তব্য ও পরামর্শ সাদরে গ্রহণযোগ্য!