হারিয়ে যাওয়া শৈশব
একটি আত্মত্যাগের গল্প ও ভালোবাসার অমর গাঁথা
📖 গল্পের সারসংক্ষেপ (Synopsis)
‘হারিয়ে যাওয়া শৈশব’ গল্পটি এক নিঃস্বার্থ ভাইয়ের অসীম ত্যাগ ও বোনকে দেওয়া কথার এক করুণ অথচ হৃদয়স্পর্শী উপাখ্যান। সড়ক দুর্ঘটনায় নিমিষেই বাবা-মাকে হারিয়ে মাত্র সাত বছরের বালক হিটেশ এবং তার তিন বছরের বোন সারা এক অনিশ্চিত অন্ধকারে পতিত হয়। নিকট আত্মীয়দের অনাদর আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিজের শৈশব, পড়াশোনা ও সব ব্যক্তিগত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে হিটেশ বেছে নেয় কঠোর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পথ। একটিই মাত্র লক্ষ্য—ছোট বোন সারাকে মানুষের মতো মানুষ করা এবং ডাক্তার বানানো। চরম ক্ষুধা, অপমান ও কষ্টের চড়াই-উৎরাই পার করে হিটেশের সেই আত্মত্যাগ অবশেষে সফলতায় রূপান্তরিত হয়। এটি কেবল বেঁচে থাকার গল্প নয়, বরং প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের জীবনের সব আনন্দ বিসর্জন দেওয়া এক অমর ভ্রাতৃত্বের দলিল।
সকালের কোমল রোদ উঠতেই ছোট্ট হিটেশ দৌড়ে গিয়ে বাবার হাত ধরে বলল, “বাবা, আজ কিন্তু আমাকে আর সারাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে, কথা দিয়েছ।” বাবা হেসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “না বাবা, আজ নয়, অন্য একদিন তোদের ঘুরতে নিয়ে যাব।” তিন বছরের ছোট্ট সারা তখন মায়ের কোলে বসে খিলখিল করে হাসছে। বাবা চিন্তা করলেন, আরও কয়েক দিন বেশি পরিশ্রমে খেটে সন্তানদের ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে।
ছোট্ট সংসার, অভাব ছিল; কিন্তু ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। দিনমজুর বাবার সামান্য আয় আর মায়ের সেলাইয়ের টাকায় কোনোমতে সংসার চলত। তবুও প্রতিটি সন্ধ্যায় চারজন একসাথে বসে খাওয়া, গল্প করা আর হাসির শব্দে ভরে থাকত তাদের ছোট্ট ঘর। বাবা ছেলে-মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে প্রতি রাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, যেন অন্তত একজন হলেও জীবনে অনেক বড় কিছু হতে পারে।
সেদিন ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। তাদের ঘুরতে যাওয়ার কথা শেরপুরের নালিতাবাড়ী ইউনিয়নের মধুটিলা ইকো পার্কে। সকালবেলা দেওখোলা বাজার থেকে সিএনজিযোগে রওনা দিয়ে তারা ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছায়। সকাল ১১টার দিকে বাসে চেপে নালিতাবাড়ী বাজারে পৌঁছায় এবং নালিতাবাড়ী থেকে রিকশাযোগে দুপুর ১২টার দিকে ইকো পার্কে গিয়ে পৌঁছায়।
সারাদিন ঘুরে বেড়ানোর পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে একটি দ্রুতগতির ট্রাক তাদের বহনকারী গাড়িকে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে চিৎকার, কান্না আর রক্তে ভেসে যায় সড়ক। হিটেশ সারাকে কোলে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে, “মা, বাবা” বলে চিৎকার করতে থাকে। আশপাশের মানুষ ছুটে এসে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসক জানিয়ে দেন—হিটেশের বাবা-মা আর বেঁচে নেই।
মাত্র সাত বছরের হিটেশ কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। সে শুধু বাবার নিথর হাত ধরে কাঁদছিল, “বাবা, উঠো... আমরা বাড়ি যাব।” পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট সারা মায়ের মুখে হাত রেখে বলছিল, “মা, তুমি কথা বলছ না কেন?” কিন্তু তাদের ডাকে আর কেউ সাড়া দেয়নি। স্থানীয় লোকজন হিটেশ ও সারাকে তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে পৌঁছে দেয়। বাবা-মায়ের লাশ দাফন করার পর হিটেশ ও সারা একেবারে একা হয়ে যায়।
বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর আত্মীয়স্বজন কয়েক দিন পাশে থাকলেও ধীরে ধীরে সবাই দূরে সরে গেল। কেউ দুই ভাইবোনের দায়িত্ব নিতে রাজি হলো না। গ্রামের এক বৃদ্ধা দয়া করে তাদের থাকার জন্য একটি ভাঙা টিনের ঘর দিলেন। কিন্তু হিটেশ ও সারা রাতে একা থাকতে ভয় পায়; মাঝে মাঝে সেই বৃদ্ধা এসে খোঁজখবর নিয়ে যেতেন।
সেখান থেকেই শুরু হলো সাত বছরের হিটেশের চরম কঠিন জীবনসংগ্রাম। যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলাধুলা করে, স্কুলে যায়, সেই বয়সে হিটেশ নিজের এবং বোনের মুখে দুমুঠো ভাত জোগাড় করার জন্য দোকানে কাজ করত, বাজারে বোঝা বহন করত, কখনো ইট টানত, আবার কখনো ক্ষেতে কাজ করত। বয়স ছোট বলে মানুষ হিটেশকে কাজে নিতে চাইত না; হিটেশ হাতে-পায়ে ধরে দু'বেলা খাওয়ার জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করত।
সারাদিনের কষ্টের শেষে যা টাকা পেত, তা দিয়ে প্রথমে সারার জন্য খাবার কিনত। নিজের জন্য কিছুই রাখত না। অনেক রাত না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ত সে। মাঝে মাঝে রাতের বেলা খিদের জ্বালায় পেটে প্রচণ্ড ব্যথা করত; কিন্তু সারা যেন কখনো বুঝতে না পারে, তাই হাসিমুখে বলত, “আমি আগেই খেয়ে নিয়েছি।”
সময় গড়াতে লাগল। হিটেশ নিজের পড়াশোনা বন্ধ করে দিলেও সারার পড়াশোনা কখনো বন্ধ হতে দেয়নি। পুরোনো বই সংগ্রহ করত, মানুষের কাছ থেকে ব্যবহৃত স্কুল ড্রেস এনে ধুয়ে পরাত। অভাবের সংসারে সারার পড়াশোনার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকে হিটেশ সর্বক্ষণিক খেয়াল রাখত। সারা পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। প্রতিবার পরীক্ষায় ভালো ফল করলে হিটেশের চোখ আনন্দে ভিজে উঠত। সে মনে মনে বলত, “মা, বাবা... আমি কথা রেখেছি। তোমাদের মেয়েকে শত কষ্টের মাঝেও মানুষ করব।”
বছরের পর বছর কেটে গেল। ছোট্ট সারা একদিন বড় হয়ে কলেজে উঠল। গ্রামের সবাই অবাক হয়ে বলত, “এই ছেলেটা নিজের জীবন শেষ করে বোনের জীবন গড়ে দিয়েছে।” হিটেশ মানুষকে অনুরোধ করত এসব কথা না বলতে, কারণ এসব কথা শুনলে তার বোনের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাবে, বোন কষ্ট পাবে। কিন্তু কেউ জানত না, হিটেশ কত রাত না খেয়ে কাটিয়েছে, কত অপমান সহ্য করেছে, কত স্বপ্ন নিজের হাতে বিসর্জন দিয়েছে। তার একটাই স্বপ্ন ছিল—সারার মুখে হাসি দেখা, সারাকে মানুষের মতো মানুষ করা।
একদিন ভালো একটি পরিবারের পক্ষ থেকে সারার বিয়ের প্রস্তাব এলো। ছেলেটি শিক্ষিত, ভদ্র এবং সচ্ছল পরিবারের। কিন্তু বিয়ের খরচ জোগাড় করার মতো সামর্থ্য হিটেশের ছিল না। হিটেশ চিন্তা করল নিজের ভিটেমাটি বিক্রি করে বোনের বিয়ে দেবে, কিন্তু সারা বিয়ে করবে না বলে তীব্র আপত্তি জানাল। হিটেশ সারাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সারা কোনোভাবেই রাজি হলো না। একরকম সারার পীড়াপীড়িতে হিটেশ বিয়ের চিন্তাভাবনা আপাতত মন থেকে সরিয়ে নিল।
হিটেশের স্বপ্ন ছিল সারাকে ডাক্তার বানাবে। কারণ, তার বাবা-মা যখন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান, তখন হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসার অভাবে তারা প্রাণ হারান—সেই মর্মান্তিক স্মৃতি হিটেশের মনে বোনকে ডাক্তার বানানোর প্রবল ইচ্ছা জাগিয়ে তুলেছিল। পরবর্তীতে সারা মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য সারা দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করতে থাকে।
দেখতে দেখতে সারা পড়াশোনা শেষ করে ফেলে। ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ করার পর হিটেশ সারাকে জানায়—কোনো মানুষ যেন সঠিক চিকিৎসার অভাবে মারা না যায়, সে বিষয়টা যেন সে সর্বদা মাথায় রাখে। বোন সারা ভাইয়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং আশ্বাস দেয়, কোনোদিনও তার জীবনে এমন ঘটনা ঘটতে দেবে না।
সারা অত্যন্ত সৎ এবং পরিশ্রমী হওয়ায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। প্রতিদিন প্রচুর রোগী ডক্টর সারার নিকট চিকিৎসা গ্রহণ করতে আসে। এসব দেখে হিটেশের বুক গর্বে ভরে ওঠে। পরবর্তীতে হাসপাতালের এক চিকিৎসকের সাথে সারার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে হিটেশ চিন্তা করে, যেহেতু বোন বড় হয়েছে, এখন তার বিয়ে দেওয়া উচিত। বোনের সুখের কথা চিন্তা করে হিটেশ সেই চিকিৎসকের পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। দুই পরিবারের দেখা-সাক্ষাতের পর বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত হয়।
বিয়ের দিন সারা কাঁদতে কাঁদতে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল, “ভাইয়া, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।” হিটেশ চোখের পানি লুকিয়ে বলল, “বোকা মেয়ে, আজ মা-বাবা থাকলে তারাও তোকে এভাবেই বিদায় দিতেন। আজ থেকে তোর নতুন জীবন শুরু হবে। সুখে থাকিস, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
সারা চলে যাওয়ার পর হিটেশ বাবা-মায়ের সেই পুরোনো ভিটেতে এসে টিনের ঘরটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। অশ্রুসিক্ত দু'চোখে ঘরটা আরও নির্জন মনে হতে লাগল। যে ঘরে একসময় বাবা-মায়ের হাসি, সারার দুষ্টুমি আর হিটেশের ছুটোছুটি ছিল, সেখানে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা। তবুও প্রতিদিন সন্ধ্যায় হিটেশ আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে, “মা, বাবা... আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। তোমাদের মেয়েকে ডাক্তারি পড়াশোনা করিয়ে ডাক্তার বানিয়ে বিদায় দিয়েছি।”
কয়েক মাস পর একদিন সারা তার স্বামীকে নিয়ে ভাইয়ের কাছে এলো। সঙ্গে ছিল নতুন কাপড়, খাবার আর অনেক ভালোবাসা। বিদায় নেওয়ার সময় সারা ভাইয়ের হাত ধরে বলল, “আজ আমি সুখে আছি শুধু তোমার জন্য। তুমি শুধু ভাই নও, তুমি আমার বাবা, তুমি আমার মা, তুমি আমার পুরো পৃথিবী।”
হিটেশ আর নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, কোথাও না কোথাও বাবা-মা নিশ্চয়ই আজ হাসছেন। কারণ তাদের ছোট্ট ছেলে নিজের শৈশব হারিয়ে, নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে একটি জীবনকে সুন্দর করে তুলেছে। পৃথিবীতে অনেক ধনী মানুষ আছে, কিন্তু নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে অন্যের জীবন গড়ে তোলার মতো মানুষ খুব কম। সেই মানুষগুলোর নাম হয়তো ইতিহাসে লেখা থাকে না, কিন্তু যাদের জন্য তারা বাঁচে, তাদের হৃদয়ে তারা সারাজীবন অমর হয়ে থাকে।


0 মন্তব্যসমূহ
কেমন লাগলো বা আপনার মতামত কমেন্ট করে জানান। গঠনমূলক যেকোনো মন্তব্য ও পরামর্শ সাদরে গ্রহণযোগ্য!