সর্বস্বান্ত


সর্বস্বান্ত - নাহিদ আমিন

সর্বস্বান্ত

রচনা ও পরিবেশনায়: নাহিদ আমিন
একটি মর্মান্তিক ও শিক্ষণীয় গল্প

গ্রামের শেষ প্রান্তে বুড়িগঙ্গার স্রোত যেখানে ভেসে যায়, তার কোলঘেঁষে ছিল শফিকের ছোট্ট তালপাতার ছাউনি দেওয়া ঘর। বছর দুয়েক আগেও সংসারটা ছিল সুখ-শান্তিতে ভরা। শফিক পাশের বাজারের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করত, আর তার স্ত্রী মিনু বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করে স্বামীর সংসার খরচে হাত বাড়াত। অল্প আয় হলেও তাদের জীবন ছিল ভালোবাসা আর স্বপ্নে ভরপুর। ছোট্ট মেয়ে আমিনাকে ঘিরেই ছিল তাদের সব আশা ও স্বপ্ন।

শফিকের একটা বাজে স্বভাব ছিল, প্রায়শ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফেরা। এজন্য অবশ্য মিনু মাঝেমধ্যেই শফিকের ওপর মেজাজ হারিয়ে ফেলত।

একদিন রাতে পাড়ার ক্লাবঘরে আড্ডা দেওয়ার সময় শফিক লক্ষ করল তার বন্ধু সজীব কোনো চিন্তা ছাড়া অনায়াসে বন্ধুদের পেছনে অনেক টাকা নষ্ট করছে। কৌতূহলবশত শফিক সজীবকে জিজ্ঞাসা করল, "বন্ধু, একটা কথা বলি?" সজীব তখন অন্য বন্ধুর সাথে খিলখিল করে হেসে গল্প করছিল। শফিকের কথা শুনে সজীব বলল, "হ্যাঁ, বল বল।"

শফিক একটু ইতস্ততভাবে বলল, "বন্ধু, না মানে আমি জানতে চাচ্ছি তুই কোনো চাকরি-ব্যবসা করিস না, তাহলে তুই প্রতিদিন এত টাকা কোথায় পাস?"

শফিকের কথা শুনে সজীব এক পলকে তাকিয়ে শফিককে বলল, "বন্ধু, আমার কাছে সোনার খনি আছে!"

এই বলে সজীব পুনরায় হাসতে লাগল। সজীবের কথার কোনো অর্থ বুঝতে না পেরে শফিক পুনরায় বলল, "বন্ধু, মানে বলছিলাম কি, আমাকেও যদি একটু টাকা আয়ের রাস্তা দেখাস! আসলে তোর ভাবীর সাথে সংসারে অভাব-অনটন নিয়ে প্রতি রাতেই ঝগড়া লাগে।"

সজীব বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে, কাল সন্ধ্যার পর আমার সাথে দেখা করিস। আমি তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাব।" সজীবের কথা শুনে শফিক খুশি মনে সেদিন বাড়ি চলে আসে। সে মনে মনে ভাবতে থাকে, সজীব যদি বিনা পরিশ্রমে এত টাকা আয় করতে পারে, তাহলে আমি তার দ্বিগুণ আয় করতে পারব। কারণ আমি সজীবের চেয়ে বেশি পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীল।

পরদিন মাগরিবের আজানের পরপর শফিক বাড়ি থেকে বের হয় সজীবের উদ্দেশ্যে। সজীব এলাকার ক্লাবঘরে তখন ক্যারাম বোর্ড খেলছিল। শফিক হাসিমুখে সজীবের কাছে গেলে সজিব তাকে নিয়ে আসমানী বালার পুরোনো পুকুরপাড়ের পিছনে অনেক বছর আগের একটা পুরোনো ভাঙা মন্দিরের ভেতরে নিয়ে যায়।

শফিক প্রথমে সজীবের এখানে আসার উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না। পরে চোখের সামনে টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি দেখে বুঝতে পারে, এটা একটা আলাদা জগৎ। সজীব বলে, "বন্ধু, এটা হলো আমার সেই সোনার খনি। তোমাকে খনি থেকে সোনা উত্তোলনের জন্য মাথা খাটিয়ে সন্ধান করতে হবে। যদি লেগে যায়, তাহলে তোমার সারাদিন যাবে ফুরফুরা।"

সজীবের কথা শুনে শফিক প্রথমে একটু ইতস্ততার মধ্যে পড়ে যায়। কারণ শফিক এত বড় হয়েছে, কখনো কোনো দিন হারামভাবে টাকা ইনকাম করেনি। তাই সে মনে মনে জুয়া খেলে টাকা ইনকাম করার বিষয়ে মন সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু ভাবতে ভাবতেই সজীব জুয়া খেলায় বসে পড়ে। পেছনে শফিক দাঁড়িয়ে পুরো বিষয়গুলো লক্ষ্য করছে। পর পর দুটো বড় দাম জিতে সজীবের মন আত্মহারা হয়ে যায়। সে খুশিতে বাকবাকুম করতে থাকে। সজীব হাসতে হাসতে বলে, "কী বন্ধু, খেলবি নাকি এক দাম?"

সজীবের কথা শুনে শফিক বুঝতে পারছে না কী করবে। একে তো জুয়া খেলার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তার ওপর সারাদিনের ইনকাম পকেটে না থাকলে রাতে খাবার নিয়ে যাবে কীভাবে? বউকে কীভাবে বোঝাবে? এসব ভাবতে ভাবতে শফিক হঠাৎ পকেট থেকে একশ টাকা বের করে জুয়ার বোর্ডে লাগায়। সেই দাম কী এক অলৌকিক ভাবে শফিক জিতে যায়। তারপরও মাঝে মাঝে একটা করে দাম ধরে মোটামুটি ভালো টাকা ইনকাম করে।

শফিক আর সজীব জুয়া খেলা শেষ করে রাত একটার দিকে খুশি মনে বাড়ি ফিরে। পরদিন সকালে শফিক আর কাজে যায় না। তার চিন্তা হলো, এক ঘণ্টা মনযোগ দিয়ে জুয়া খেললে যদি এক হাজার টাকা লাভ করা যায়, সারাদিন পরিশ্রম করে পাই দুশো টাকা—তাহলে বৃথা পরিশ্রম করার কী দরকার? যেই কথা সেই কাজ, শফিক পরের দিন থেকে প্রতিদিন জুয়াতে বসে কিছু না কিছু লাভ করে নিয়ে আসে।

একদিন সন্ধ্যায় শফিকের মেয়ে আমিনা হঠাৎ করে বমি করতে থাকে। কোনোভাবেই আমিনாவின் বমি কমছে না। শফিক কবিরাজের কাছ থেকে তেলপড়া আনে, তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। তাই শফিক ভাবে, আমার মেয়ের বমি বন্ধ করার জন্য এখন সঠিক চিন্তা হলো আমাকে জুয়া খেলে টাকা ইনকাম করে মেয়েকে শহরে বড় ডাক্তার দেখাতে হবে। তাই শফিক অসুস্থ মেয়েকে স্ত্রীর কাছে রেখে রাতের বেলা জুয়া খেলতে বেরিয়ে পড়ে। পিছন থেকে তার স্ত্রী হাতে-পায়ে ধরলেও শফিক তার কথা শোনে না।

শফিক আজ দুহাজার টাকা নিয়ে জুয়াতে এসেছে। পুরো মনযোগ দিয়ে জুয়া খেলেও বারবার হারতে হচ্ছে। মনে হয় ভাগ্য কেন জানি আজ সহায় হচ্ছে না। রাত যত গভীর হতে লাগল, শফিকের পকেটে টাকা কমতে লাগল। একসময় শূন্য পকেট নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

এদিকে বাড়ি এসে শফিক জানতে পারে তার মেয়ের শরীরের অবস্থা ভালো নয়। জরুরি কিছু একটা করা দরকার। শফিক ভাবে, কাল জুয়া খেলে বড় টাকা জয়লাভ করে তার মেয়েকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শফিক কোথাও যায়নি, তার মেয়ের কাছেই বসেছিল। শফিকের স্ত্রী মিনু বলে, "আমার মেয়েটা গত দুদিন যাবত অসুস্থ, তুমি কোনো কাজও করছ না আবার মেয়েটাকে ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যাচ্ছ না।"

শফিক কোনো কথার জবাব না দিয়ে আস্তে করে বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা জয়নালের সোনার দোকানে উপস্থিত হয়। জয়নাল শফিককে দেখে বলে, "কী ব্যাপার শফিক ভাই, এত রাতে আমার দোকানে কী করতে আসলে, সোনা বানাবা নাকি?"

শফিক মাথা নিচু করে বলে, "ভাই, আমার মেয়েটা অনেক অসুস্থ, হাতের অবস্থাও তেমন ভালো না। তোমার ভাবীর সোনার কানের দুলটা বিক্রি করে কিছু টাকা পেলে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে বড় ডাক্তার দেখাতে যেতাম।"

জয়নালের মায়া হলো, কারণ তারও মেয়েটা শফিকের মেয়ের সাথে একই ক্লাসে লেখাপড়া করে। শফিকের কাছ থেকে কানের দুল জোড়া নিয়ে পাঁচ হাজার টাকা শফিককে দিয়ে জয়নাল বলল, "এই নেও ভাই, আমার যতটুকু দেওয়া দরকার তার চেয়ে বেশি দিলাম। যেহেতু তোমার মেয়ের অসুস্থতার কথা বলেছ।"

শফিক পরক্ষনেই দোকান থেকে বের হয়ে দ্রুত মন্দিরের পিছনের জঙ্গলের দিকে হাঁটতে শুরু করে। যেহেতু শফিকের কাছে আজ পাঁচ হাজার টাকা আছে, তাই সে চিন্তা করছে আজ ভালো টাকা লাভ হবে। এসব চিন্তা করতে করতে জুয়ার বোর্ডে বসে পড়ে। রাত গভীর হচ্ছে, কিন্তু শফিক কেন জানি অজানা কারণে আর ভালো করতে পারছে না। সে যতবার মনযোগ দিয়ে খেলতে চায়, ততবার কী যেন অজানা চিন্তা মাথায় চলে আসে আর সে হেরে যায়। একসময় রাত গড়িয়ে সকাল নেমে আসে, শফিক শূন্য হাতে আজও বাড়ি ফিরে।

সকালবেলা খালি হাতে বাড়ি ফিরলে শফিকের স্ত্রী শফিককে সারারাত বাইরে কোথায় ছিল জানতে চাইলে শফিক কোনো জবাব দেয় না। শফিকের স্ত্রী কান্না করে বলে, "আমার মেয়েটা অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে আর তুমি কোনো কথাই শুনতেছ না। আসলে তোমার হয়েছেটা কী?"

শফিক কিছু বলে না। একপর্যায়ে শফিকের স্ত্রী মিনু শফিককে জানায় তার বিয়ের সময় পাওয়া একজোড়া কানের দুল আছে, কাল সেগুলো বিক্রি করে যেন মেয়েকে শহরে নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখায়। এসব বলতে বলতে শফিকের স্ত্রী তার কানের দুল জোড়া আনতে গিয়ে দেখে ট্রাঙ্কের ভেতরে রাখা কানের দুল জোড়া নাই।

শফিককে জিজ্ঞাসা করলে শফিক জানায় সে জানে না। কিন্তু শফিক, তার স্ত্রী মিনু আর তাদের ছোট মেয়ে আমিনা ছাড়া এই ছোট বাড়িতে আর কেউ থাকে না। শফিকের স্ত্রী জোরাজ্জুরি করে রাগের মাথায় শফিককে বলে, "আমার কানের দুল নিয়ে কী করেছ, জুয়া খেলেছ নাকি?"

শফিক ভাবে তার বউ বিষয়টা ধরে ফেলছে, তাই শফিকের মাথায় রাগ উঠে যায় এবং রাগের মাথায় শফিক তার স্ত্রীর গালে কষে এক থাপ্পর মেরে বলে, "হ্যাঁ, আমি জুয়া খেলেছি। আর জুয়া খেলে তোর মেয়ের চিকিৎসার করার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সবগুলি হারিয়ে ফেলেছি।"

এসব শুনে শফিকের স্ত্রী মিনু তো অবাক হয়ে যায়। সে আর কোনো কথা না বলে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়। মিনু ভাবতে থাকে, আমি যেই মানুষটাকে এতদিন পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ ভেবে এসেছি, আজ সে আমাকে কী শোনালো! মিনু তো বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার নিজের স্বামী জুয়া খেলে।

রাতের বেলা শফিকের মেয়ে আমিনা একাধিকবার বমি করে। শরীরের অবস্থা অবনতি হতে একপর্যায়ে চোখের পাতা বন্ধ করে ওপারে চলে যায়। আমিনার মৃত্যুতে মিনু শোকে পাথর হয়ে যায়। এক সপ্তাহ মেয়ের কবরের পাশে বসে থেকে পরে একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে পাশের আম গাছের ডালে শাড়ি পেচিয়ে আত্মহত্যা করে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য

গল্পটা কাল্পনিক হলেও বাস্তব জীবনে আমাদের আশেপাশে অনেক মানুষ এই জুয়াতে আসক্ত হয়ে নিজেদের ভিটেমাটি বিক্রি করে এখন পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ আবার ঋণের চাপে দেশ-দেশান্তর হয়ে ঘুরে বেড়ায়। জুয়া মানুষের জীবনে সুখ ডেকে আনে না, জুয়া একটি অভিশাপ। আসুন আমরা এই অভিশাপের বেড়া থেকে নিজে বেরিয়ে আসি এবং অপরকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করি।

জুয়ারীদের ধারণা, কিছু টাকা যেহেতু হেরেছি, আজ এই টাকা তুলেই আর খেলব না—এই চিন্তা করতে করতে একসময় পথের ফকির হয়ে যায়। তাই জুয়ার অন্ধকার থাবা থেকে আমাদের সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং কেউ জড়ালে তাদেরকেও বেরিয়ে আসার জন্য সহযোগিতা করতে হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ