যদি শেষ পযর্ন্ত তুমিই থাকো

যদি শেষ পর্যন্ত তুমিই থাকো

গল্প • রোমান্টিক ডায়েরি

ছয় বছর আগে এক বৃষ্টিভেজা সকালে আরিফের সাধারণ দিনের মতোই দিন কাটছিল। কিন্তু ভাগ্যের লিখন কি আর খণ্ডানো যায়? কোনো ধারণাই ছিল না যে, সেদিনের মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের একটি চোখাচোখি তার পুরো জীবন বদলে দেবে এবং শুরু হবে তার নতুন এক অধ্যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি। সবাই যে যেভাবে পারছে আশ্রয় খুঁজছে। আরিফ ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় একটি সাদা ওড়না উড়ে এসে জড়িয়ে গেল আরিফের হাতে। ওড়নার মালিক দৌড়ে এসে লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল, "সরি... ইয়ে মানে, আমার ওড়নাটা..."

আরিফ কোনো কথা বলল না। শুধু ওড়নাটা এগিয়ে দিয়ে মেয়েটার চোখের দিকে একবার তাকাল। সেই চোখে ছিল অদ্ভুত এক মায়া—যেন বহুদিনের চেনা! আরিফ মুহূর্তের মধ্যেই এক কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল। আরিফ ভাবতে লাগল, মানুষ এত সুন্দর এবং মায়াবী হয় কীভাবে!

মেয়েটি মিষ্টি করে ধন্যবাদ বলে চলে যাওয়ার সময় আরিফের ঘোর কাটল। সেদিন তাদের পরিচয় হয়নি, নামও জানা হয়নি। কোথায় থাকে মেয়েটি, কী করে—তার কিছুই জানা হয়নি। শুধু দুজন দুজনকে একবার দেখেছিল। তাতেই যেন আরিফের বুকের ভিতর উথাল-পাথাল ঢেউ উঠে গেল।

কিন্তু ভাগ্য যেন আগে থেকেই তাদের গল্প লিখে রেখেছিল। চলুন সামনের দিকে যাই, আরিফের উড়ুউড়ু মন কি আসলেই সেই মেয়েটিকে পেয়েছিল কি না!

পরদিন প্রথম ক্লাসে ঢুকেই আরিফ অবাক হয়ে গেল। সামনের সারিতে বসে থাকা সেই একই মেয়েটি! আর মেয়েটিও বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা কেটে যাওয়ার পর আরিফ তার সিটে বসল।

সেদিনের সেই হাসি থেকে শুরু হয়েছিল একটি গল্প—যে গল্পে ছিল ছয় বছরের অপেক্ষা, হাজারো স্মৃতি, অসংখ্য অভিমান, অগণিত স্বপ্ন, বিশ্বাস আর অফুরন্ত ভালোবাসা।

পরদিন ক্লাসে পরিচয় পর্ব শুরু হলে 'বৃষ্টি' আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টি বলল, "আরিফ ও মেহেরিন।" আমি কিছুটা বোকার মতো বললাম, "হুম।" বৃষ্টি আবার বলল, "মেহেরিন ও আরিফ।"

সেদিনের পরিচয় ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে বদলে গেল। একসঙ্গে ক্লাস, লাইব্রেরি, ক্যান্টিনে চা, পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়া—প্রতিটি দিন যেন অজান্তেই দুজনকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এল। তারা বুঝতেই পারেনি, কখন একজন আরেকজনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এখন আরিফের কোনো কাজে মেহেরিনকে পাশে না পেলে ভালো লাগে না।

একদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকের ধারে বসে মেহেরিন হঠাৎ বলেছিল, "জানো, মানুষ নাকি সবচেয়ে বেশি ভয় পায় প্রিয় মানুষটাকে হারাতে। এর চেয়েও বেশি ভয় পায় নিজের মানুষটাই যখন অন্য কারও হয়ে যায়—সেটা দেখতে।"

আরিফ হেসে উত্তর দিয়েছিল, "তাহলে আমি খুব ভীতু মানুষ।"

মেহেরিন অবাক হয়ে তাকাতেই সে বলল, "কারণ তোমাকে হারানোর কথা আমি ভাবতেই পারি না।" সেদিন মেহেরিন কিছু বলেনি, শুধু নিঃশব্দে নিজের হাতটা আরিফের হাতে রেখে দিয়েছিল। সেই স্পর্শই ছিল তাদের ভালোবাসার প্রথম স্বীকারোক্তি। সেদিনের সেই কথার পর থেকে মেহেরিন মনে মনে আরিফকে আরও বেশি ভালোবাসতে শুরু করল।

এরপর শুরু হলো তাদের সুন্দর সময়। ঈদের সকালে প্রথম শুভেচ্ছা, জন্মদিনে হাতে লেখা চিঠি, পরীক্ষার ফলের আনন্দ, হঠাৎ রিকশায় করে শহর ঘোরা, ছোট রেস্টুরেন্টে একসাথে খাওয়া, সময় কাটানো, গল্প করা, আনন্দ ভাগাভাগি করা—জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সুখ হয়ে উঠেছিল। দামি উপহারের চেয়ে একটি গোলাপ, দীর্ঘ ভ্রমণের চেয়ে এক কাপ চা—এসবই তাদের ভালোবাসাকে গভীর করে তুলেছিল।

কিন্তু ভালোবাসার গল্পে শুধু হাসি থাকে না, তিক্ততাও থাকে বটে!

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার পর বাস্তবতা দুজনকে আলাদা ব্যস্ততায় টেনে নিল। আরিফ চাকরির প্রস্তুতিতে দিন-রাত এক করে ফেলল। অন্যদিকে মেহেরিন পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল। আগে যেখানে দিনে দশবার কথা হতো, এখন কখনও কখনও দুদিনেও ঠিকমতো কথা হতো না। দুজনেই নিজেদের ক্যারিয়ার এবং পরিবারকে সাহায্য করা শুরু করল।

একদিন সামান্য একটি ভুল বোঝাবুঝি বড় ঝগড়ায় রূপ নিল। কেউ কাউকে অপমান করেনি, তবুও দুজনেই চুপ হয়ে গেল। "আগে সে ফোন করুক"—এই অপেক্ষায় কেটে গেল সপ্তাহের পর সপ্তাহ। রাতে ঘুমানোর আগে দুজনেই একে অপরের ছবি দেখত, পুরোনো চ্যাট পড়ত। কিন্তু একটি বার্তা পাঠানোর সাহস কারও হতো না।

চার মাস পর হঠাৎ খবর এল, মেহেরিনের বাবা গুরুতর অসুস্থ। খবর শুনেই আরিফ সকল কাজ বাদ দিয়ে কোনো দ্বিধা না করে হাসপাতালে পৌঁছে গেল। করিডোরের এক কোণে বসে থাকা মেহেরিনকে দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল। আগের সেই প্রাণবন্ত হাসিটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে!

ধীরে গিয়ে পাশে বসে আরিফ বলল, "এত কষ্ট একা একা কেন সহ্য করছ? আমাকে একটু দাও।"

মেহেরিন চোখের জল মুছে ফিসফিস করে বলল, "কারণ তুমি ছিলে না।"

এই একটি বাক্যই চার মাসের সমস্ত অভিমান গলিয়ে দিল। আরিফ কোনো উত্তর দিল না, শুধু শক্ত করে মেহেরিনের হাত ধরে রাখল। অনেক সময় ক্ষমা চাওয়ার জন্য শব্দ লাগে না; একটি স্পর্শই যথেষ্ট!

সেদিনের পর তারা নতুন করে সম্পর্ক শুরু করল এবং একটা নিয়ম বানাল—যত বড় ঝগড়াই হোক, কোনোদিন রাত শেষ হওয়ার আগে অন্তত একজন বলবে, "রাগ থাক, কিন্তু কথা বন্ধ নয়।"

দেখতে দেখতে ছয় বছর কেটে গেল। আরিফ চাকরি পেল। প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে সে একটি আংটি কিনল। দামি ছিল না, কিন্তু তার ছয় বছরের স্বপ্ন সেই ছোট্ট আংটির ভেতর লুকিয়ে ছিল। আরিফ মেহেরিনকে ফোন করল, দেখা করল এবং মেহেরিনকে নিয়ে গেল সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে—যেখানে প্রথম বৃষ্টিভেজা চোখাচোখি হয়েছিল।

চারদিকে হালকা বাতাস, গাছ থেকে লাল ফুল ঝরে পড়ছে। মেহেরিন জানত না আরিফ তাকে কেন এখানে নিয়ে এসেছে। মেহেরিন প্রশ্ন করল, "এখানে কেন নিয়ে এসেছ?"

আরিফ কোনো কথা না বলে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, "ছয় বছর আগে তুমি না জেনেই আমার জীবনে এসেছিলে। আজ জেনে-শুনে আমার পুরো জীবনটা কি নিজের করে নেবে?"

মেহেরিনের চোখ ভিজে উঠল। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল, "একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।"
"বলো।"
"কোনো একদিন যদি আবার ঝগড়া হয়?"

আরিফ মৃদু হেসে উত্তর দিল, "তাহলে আগের মতো অপেক্ষা করব না। কারণ আমি শিখেছি, অভিমান কখনো ভালোবাসার চেয়ে বড় হতে পারে না।" অভিমান করলে ঠকতে হয়, ভালোবাসা হারাতে হয়, জীবনে কষ্ট পেতে হয়।

মেহেরিন হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে দিল। আংটিটা তার অনামিকায় পরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তে আবারও বৃষ্টি নামল। দুজনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। মনে হলো, ছয় বছর আগে যে বৃষ্টি তাদের প্রথমবার এক করেছিল, আজ সেই বৃষ্টিই তাদের ভালোবাসাকে চিরদিনের জন্য আশীর্বাদ করে গেল।

"ভালোবাসা মানে শুধু একসঙ্গে হাসা নয়। ভালোবাসা মানে অপেক্ষা করা, ভুল স্বীকার করা, ফিরে আসার সাহস রাখা এবং হাজারো ঝড়ের পরও একই মানুষটির হাত শক্ত করে ধরে বলা—শেষ পর্যন্ত, তুমিই আমার ঠিকানা।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ