শেষ চৌকাঠ (পর্ব-৩)

শেষ চৌকাঠ - পর্ব ৩: গ্যারেজ জীবন | নাহিদ আমিন
পুরোনো গ্যারেজে পোড়া মবিলের কাজ করা বালক

শেষ চৌকাঠ

লেখক: নাহিদ আমিন
পর্ব–৩

গ্যারেজ জীবন

"শৈশব হলো এক টুকরো নীল আকাশ, কিন্তু যখন ভাগ্য সেই আকাশে কালো মেঘ ঢেলে দেয়, তখন বারো বছরের শিশুর কাঁধে এসে পড়ে আশি বছরের এক বৃদ্ধের বোঝা..."

আশুলিয়ার সেই বর্ষণস্নাত গোধূলিটা জয়নালের জীবনের সমস্ত আলো এক নিমেষে নিভিয়ে দিল। ঢাকা-আশুলিয়া বাইপাস সড়কের মোড়ে বৃষ্টিভেজা পিচ্ছিল পিচে একটি দ্রুতগামী ট্রাক জয়নালের রিকশাটিকে দুমড়ে-মুচড়ে ড্রেনে ফেলে দেয়। রক্তাক্ত, সংজ্ঞাহীন জয়নালকে যখন স্থানীয় লোকজন সাভারের এক পথপ্রান্তিক ক্লিনিকে নিয়ে এলো, ততক্ষণে তার ডান পায়ের হাড় গুঁড়িয়ে কয়েক টুকরো হয়ে গেছে। খবর পেয়ে সখিনা যখন বারো বছরের বালক আরাফের হাত ধরে হাসপাতালে পৌঁছাল, তখন অপারেশনের টেবিল থেকে ভেসে আসছে অপারগ ডাক্তারের কঠিন রায়—জয়নাল আর কোনোদিন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভারী কাজ করতে পারবে না। সারা জীবন যে মানুষটা নিজের ঘাম বিক্রি করে পরিবারকে আগলে রেখেছিল, সে আজ বিছানায় এক অসহায় পঙ্গু মানবদেহ। বাড়িওয়ালার বকেয়া ঋণ, হাসপাতালের ওষুধের বিল আর ঘরে ছোট ছোট আরও দুটো ভাইবোনের খিদের হাহাকার—সব মিলিয়ে জয়নালের পলিথিনের ঘরটায় অন্ধকার যেন আগের চেয়ে আরও শতগুণ ঘন হয়ে নেমে এলো।

হাসপাতাল থেকে ফেরার পর জয়নাল এককোণে চটের ওপর শুয়ে থেকে নীরবে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলত। সখিনা মানুষের বাসায় বাসায় ঝিয়ের কাজ শুরু করেছিল ঠিকই, কিন্তু তিন বাড়ির বাসন মেজে যে কয়েকশো টাকা পেত, তা দিয়ে জয়নালের ব্যথানাশক ওষুধ কেনার পর চালের পুঁটুলিতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। বারো বছরের আরাফ এতদিন বস্তির সামনের এক প্রাথমিক নৈশবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বইয়ের পাতায় নীল পরীর গল্প পড়ত। তার চোখে স্বপ্ন ছিল—সে বড় হয়ে জয়নালের মতো শক্ত একজন মানুষ হবে, তাদের গ্রামের হারানো ভিটেমাটি ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু জয়নালের সেই ভাঙা পা আর সখিনার খাটতে খাটতে শুকিয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তাকিয়ে আরাফের ভেতরের ছোট শিশুটা এক রাতেই মারা গেল। সে নৈশবিদ্যালয়ের সেই ছেঁড়া বাংলা বইটা সযত্নে কাঁথা চাপা দিয়ে রেখে বেরিয়ে পড়ল বাইরের কঠিন দুনিয়ায়। বারো বছরের ছোট হাত দুটো দিয়ে এখন আর বইয়ের পাতা উল্টানো হবে না; তাকে আঁকড়ে ধরতে হবে পোড়া মবিল আর গ্রিজের দুর্গন্ধময় লোহালক্কড়।

আশুলিয়ার গলি ঘেঁষে কালাম মিয়ার রিকশা ও টেম্পু গ্যারেজ। সারাদিন সেখানে তেলের পোড়া গন্ধ, ওয়েল্ডিংয়ের আগুনের স্ফুলিঙ্গ আর মেকানিকদের কটু গালিগালাজ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। কালাম মিয়া প্রথমে আরাফকে কাজে নিতে চায়নি। "এত ছোট পোলারে দিয়া গ্যারেজের কাজ হইবো না, ও তো একটা ভারী চাকাও তুলতে পারবো না!" জয়নালের পঙ্গুত্বের কথা আর আরাফের অনমনীয়, আকুল চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে শেষমেশ কালামের মন গলল। দৈনিক ত্রিশ টাকা আর দুপুরে একমুঠো বাসি ভাতের বিনিময়ে আরাফ গ্যারেজের 'গ্রিজ বয়' বা ছোট মেকানিক হিসেবে যোগ দিল। প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত পোড়া মবিলে হাত চুবিয়ে রিকশার বল-বেয়ারিং গ্রিজ করা, টায়ারে হাওয়া দেওয়া আর মেকানিক ওস্তাদদের বকাঝকা সহ্য করাই হয়ে উঠল তার দৈনন্দিন নিয়ম। প্রথম প্রথম সারা দিন খাটুনির পর আরাফের কচি হাতের আঙুলগুলো ব্যথায় অবশ হয়ে যেত, নখের কোণে জমে থাকা পোড়া কালো মবিল কিছুতেই সাবান দিয়ে উঠত না।

"হাত থেকে যখন বইয়ের পাতা খসে পড়ে লোহালক্কড়ের ঘর্ষণ শুরু হয়, তখন চোখের জল আর পোড়া মবিল মিশে যে রঙ তৈরি হয়—তার নামই দারিদ্র্য।"

কিন্তু এই নরকতুল্য গ্যারেজের ধোঁয়ার মধ্যেও আরাফের ভেতর এক অদ্ভুত নীরব দায়িত্ববোধ জন্ম নিল। সে কখনো জয়নাল বা সখিনার সামনে কষ্টের এক ফোঁটা অনুভূতিও প্রকাশ করত না। রাতে গ্যারেজ বন্ধ করে যখন বাড়ি ফিরত, তখন তার ছোট পকেটে গোঁজানো থাকত ত্রিশটি টাকা। পলিথিনের ঘরে ঢুকে সখিনার হাতে টাকাগুলো তুলে দিয়ে সে বলত, "মা, আজ ওস্তাদ আমার কাজে খুশি হইয়া আর পাঁচটা টাকা বেশি দিছে। তুমি আকবরের জন্য একটু সুজি কিইন্যা আইনো।" জয়নাল বিছানায় শুয়ে হাত বাড়িয়ে আরাফকে কাছে ডাকত। জয়নালের সেই কাঁপা কাঁপা হাত দুটো যখন আরাফের গ্রিজমাখা মাথায় হাত বুলিয়ে দিত, তখন জয়নাল ফিসফিস করে বলত, "আরাফ রে... বাপ আমার... তোর জীবনের স্বপ্নগুলা আমি পঙ্গু হইয়া কাইড়া নিলাম রে..." আরাফ বাবার হাত দুটো নিজের ছোট মুখে চেপে ধরে শক্ত গলায় বলত, "না বাবা, তুমি কিচ্ছু কাইড়া নাও নাই। আমি ভাইবোনদের পড়ামু, তোমার পা ভালো করামু। তুমি শুধু আমাদের মাথায় হাত রাইখা বইসা থাকো।"

আরাফ শুধু নিজের কষ্টেই থামেনি, সে দেখতে পাচ্ছিল সংসারের খরচ দিন দিন বাড়ছে। ভাই আকবর ছোট, আনাস কেবল স্কুলে পা দিচ্ছে। সখিনা একা আর কত খাটবে? গ্যারেজের ফাঁকে ফাঁকে আরাফ তাই লোকাল লেগুনা আর বাসের হেলপারি শুরু করল। বাসের দরজায় ঝুলে ঝুলে 'গাবতলী... বাইপাস... নবীনগর' বলে চিৎকার করা বারো-তেরো বছরের ছেলেটার গলায় এমন এক তাগিদ ছিল, যা অন্য যেকোনো মানুষকে স্তব্ধ করে দিত। কখনো কখনো স্থানীয় বখাটে বা হেলপারদের ধাক্কায় বাস থেকে পড়ে গিয়ে তার হাঁটু ছিলে রক্ত বের হতো, শার্ট ছিঁড়ে যেত। কিন্তু আরাফ রক্ত মুছে আবার বাসের পাইপ ধরে ঝুলত। কারণ সে জানত, আজকে যদি সে অতিরিক্ত বিশটা টাকা বেশি না পায়, তবে কালকে ছোট আনাসের স্কুলের খাতার টাকা দেওয়া হবে না, কিংবা আয়াসের জন্য এক কাপ সুজি কেনা যাবে না। নিজের শৈশব, খেলাধুলা, পড়াশোনা—সবকিছুকে সে জীবন্ত দাফন করে দিয়েছিল তার পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার এক অদৃশ্য অঙ্গীকারে।

এক দিন গভীর রাতে, যখন পুরো বস্তি নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে, সখিনা আড়ালে গিয়ে অঝোরে কাঁদছিল। আরাফ তখন এক বালতি ঠাণ্ডা পানি দিয়ে নিজের হাতের পোড়া মবিল খসানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সাবানের ফেনাও সেই জঘন্য কালো দাগ মুছতে পারছে না। সখিনা ছেলের পাশে এসে বসে আঁচল দিয়ে আরাফের মুখটা মুছে দিয়ে বলল, "তোর কষ্টের দিকে তাকাইতে পারি না রে আরাফ... আমার বুকটা পাইট্টা যায়।" আরাফ মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে মলিন এক হাসি হেসে বলল, "কান্দো কেন মা? হাত কালো হইলে কি হয়, আমাদের সংসারের আলো তো জ্বলতাছে! আকবর স্কুলে যাইতাছে, আনাস বই পড়তাছে। আমি বড় হইছি না মা? এবার থেকে সংসারের সব ভার আমার। তুমি আর চিন্তা কইরো না।" বারো বছরের শিশুর মুখে এই পরিণত কথাগুলো শুনে সখিনার বুকটা শ্রদ্ধায় ও কান্নায় একাকার হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই ছেলেটা কোনো সাধারণ সন্তান নয়; সে এই ভাঙা পরিবারের একমাত্র স্তম্ভ—যে নিজে জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু পরিবারকে কোনোদিন আঁধারে তলিয়ে যেতে দেবে না।

পাঠকের মনে প্রশ্ন?

গ্যারেজের এই নির্মম পোড়া তেলের ধোঁয়া আর বাসের রডের ঘর্ষণ সহ্য করে বারো বছরের আরাফ কি পারবে তার ছোট ভাইবোনদের শিক্ষিত করে তুলতে? জয়নালের পঙ্গুত্ব আর সংসারের নতুন নতুন চাহিদা কি আরাফের কাঁধকে পুরোপুরি ভেঙে দেবে, নাকি সে হয়ে উঠবে এক নীরব মহীরুহ?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ