আশুলিয়ার বাঁশের ছাঁচ আর কালো পলিথিনে ঘেরা বস্তিটায় সকালের সূর্য কোনো আলো নিয়ে আসত না; আসত কেবল এক তীব্র, থকথকে উগ্র দুর্গন্ধ। সাভার আর ঢাকার সীমান্ত ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই মেস-বস্তিতে মানুষের বসবাস ছিল মুরগির খাঁচার মতো গাদাগাদি করে। ভোরের আবছা আলো ফুটতেই চারপাশে কাশির খকখক শব্দ, টিনের চালে বৃষ্টির অবশিষ্টাংশ গড়িয়ে পড়ার টুপটাপ শব্দ আর ড্রেনের পচা পানির ভাপের সাথে ইটভাটার কালো ধোঁয়া একাকার হয়ে যেত। তিন বছরের কচি আরাফ মায়ের ছেঁড়া সুতির আঁচলের ভেতর মুখ গুঁজে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। সারা রাতের ধকল আর সাভারের সরকারি হাসপাতালের সস্তা আতুরে ওষুধে ডায়রিয়ার বেগ কিছুটা কমলেও বাচ্চার শরীরটা নিংড়ে নিস্তেজ হয়ে গেছে। জয়নাল ভোরের ঠাণ্ডা বাতাসে পলিথিনের চটের ঝাঁপটা একটু সরিয়ে বাইরে তাকাল। তার চোখের নিচে কালচে কালি, মেহেরপুরের সবুজ মাঠ আর বাপের আমলের জোতজমি হারিয়ে ফেলে সে এখন এই কয়েক হাত পলিথিনের খাঁচায় এক আশ্রয়হীন শরণার্থী।
ঘরে একদানা চাল নেই, বাচ্চার জন্য এক ছটাক দুধ কেনার সামর্থ্যও অবশিষ্ট নেই। জয়নালের পরনে যে পুরোনো ধুতি আর মলিন ফতুয়াটি ছিল, তাও কালকের কাদা-পানিতে ভিজে আঠা হয়ে আছে। সখিনা নিঃশব্দে এককোণে বসে বাচ্চার ভেজা কাঁথাটা শুকানোর নিষ্ফল চেষ্টা করছিল। তার শুকনো ঠোঁট দুটো থেকে কোনো অভিযোগ বের হচ্ছিল না, কিন্তু তার চোখের সেই নিঃশব্দ চাহনি জয়নালের শক্ত বুকে চাবুকের মতো আঘাত করছিল। একজন সক্ষম পুরুষের পক্ষে নিজের স্ত্রীর সামনে বাচ্চার ক্ষুধার্ত ছটফটানি দেখার চেয়ে বড় শাস্তি আর কিছুই হতে পারে না। জয়নাল গামছাটা মাথায় শক্ত করে বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল। "সখিনা, আমি বাজারে যাইতাছি। কাম একটা মিলাতেই হইব। তুই বাচ্চাডারে একটু আগলায়া রাখিস।" কথাগুলো বলে জয়নাল বস্তির মেঠো কাদাপথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। তার নিজের পেটে গত দুই দিন ধরে এক দানা দানাপানি পড়েনি, বুকের ভেতরটা ক্ষুধার তীব্র কামড়ে মোচড় দিয়ে উঠছিল, কিন্তু সেই শারীরিক কষ্টকে ছাপিয়ে উঠেছিল নিজের আত্মসম্মান বাঁচানোর এক অনমনীয় রোখ।
আশুলিয়া বাইপাস মোড়ে ভোর হতেই শত শত দিনমজুর, রিকশাচালক আর ইটভাটার শ্রমিকদের হাট বসে। কুলি থেকে শুরু করে মাটি কাটার মজুর—সবাই একেকটা শ্রমের পণ্যের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। মহাজন বা ঠিকাদার এসে যাকে ইচ্ছা কম দামে দোররা মেপে ডেকে নেয়। জয়নাল কোনোদিন জীবনে কারও কাছে দয়া চায়নি; গ্রামে সে ছিল নিজের জমির স্বাধীন গৃহস্থ। কিন্তু আজ এই ইট-কাঠের নির্দয় হাটে দাঁড়িয়ে তাকে নিজের শরীরের মাংস আর ঘাম বিক্রির জন্য মাথা নিচু করে দাঁড়াতে হলো। এক ধোবা-প্যান্ট পরা রিকশা গ্যারেজের মালিক কালাম জয়নালের শক্ত গড়ন দেখে এগিয়ে এলো। "রিকশা চালাইতে পারবি? নতুন রিকশা, দৈনিক জমা তিরিশ টাকা। বাকি যা পাবি তোর।" জয়নাল জীবনে কোনোদিন রিকশার হাতলে হাত দেয়নি, কিন্তু তার চোখের সামনে ভেসে উঠল অসুস্থ আরাফের সেই ক্ষুধাতুর মুখ আর সখিনার করুণ দুটি চোখ। জয়নাল কোনো দ্বিধা না করে মাথা নেড়ে বলল, "পারুম ভাই। দেন রিকশার চাবি।"
ঢাকার পিচঢালা তেতে ওঠা রাস্তায় প্যাডেল মারা আর মেহেরপুরের কাদা-মাটিতে লাঙল চালানো এক কথা নয়। চাকা যত ঘোরে, জয়নালের পায়ের রগগুলো যেন টেনশনের তোড়ে ছিঁড়ে আসতে চায়। দুপুরের রোদ যখন মাথার ওপর এসে ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো তপ্ত হয়ে উঠল, তখন জয়নালের চোখের সামনে সরষে ফুল ভাসতে শুরু করল। ক্ষুধা, ক্লান্তি আর পিঠের ওপর উপচে পড়া শত কেজি যাত্রীর ভার—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল এখনই হয়তো সে রাস্তার ওপর আছাড় খেয়ে পড়বে। কিন্তু প্রতিবার চোখ বুজলেই তার মনে হতো, যদি সে পড়ে যায়, তবে তার তিন বছরের কচি সন্তানটা আজ রাতেও না খেয়ে থাকবে। দুপুর নাগাদ চারটা ট্রিপ মেরে জয়নাল আঠারো টাকা রোজগার করল। শরীর যখন আর চলছিল না, তখন সে রাস্তার পাশের এক টং দোকানে গিয়ে চার টাকার দুইটা লাল চা আর দুইটা শুকনা বনরুটি কিনে গোগ্রাসে গিলে ফেলল। সেই চার টাকার রুটি যেন তাকে জীবনের নতুন নিঃশ্বাস দিল, আর বাকি টাকাগুলো সে তার গামছার কোণে শক্ত করে গিঁট দিয়ে রাখল সখিনা আর আরাফের জন্য।
অন্যদিকে বস্তির সেই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকূপে সখিনার দিনটি কেটেছিল এক নারকীয় অপমানের মধ্য দিয়ে। বস্তির বাড়িওয়ালা মাতব্বর মোস্তফা মিয়া দুপুরের দিকে এসে পলিথিনের দরজায় লাথি মারল। "কই রে গ্রামের চালিয়া? ভাড়ার টেহা কই? খালি পলিথিন টাঙাইয়া শোয়ন পাইছোস? দুই দিনের মধ্যে ঘর ভাড়া আড়াইশো টেহা না দিলে জিনিসপত্র ড্রেনে ফালায়া দিমু!" মোস্তফার অশালীন গালিগালাজ আর হুমকিতে সখিনা ভয়ে কাঁপছিল। সে হাত জোড় করে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল, "আমগো একটু সময় দেন ভাইসাব, আপনার ভাই কাজে গেছে, আইলেই দিমু।" বস্তির অন্য মহিলারা দরজার আড়াল থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছিল। গ্রাম থেকে আসা গৃহস্থের বউ সখিনা কোনোদিন পরপুরুষের উঁচু গলা শোনেনি, আজ সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য বস্তির নর্দমার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে এমন অপমান সহ্য করতে হলো। সখিনা বুঝতে পারল, এই শহরে বাঁচতে হলে শুধু স্বামীর উপার্জনের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না; তাকেও নিজের লজ্জার পর্দা সরিয়ে ঘরের বাইরে পা ফেলতে হবে।
সন্ধ্যা নামার পর জয়নাল যখন ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে, কাঁপতে কাঁপতে সেই পলিথিনের ঘরে ফিরে এলো, তখন তার হাতে ছিল আধ কেজির একটা চালের পুটুলি, দুইটা ডিম আর আরাফের জন্য এক পোয়া খাঁটি দুধের ছোট এক প্যাকেট। সারাদিনের অমানবিক খাটুনির পর জয়নাল যখন টাকাগুলো সখিনার হাতে তুলে দিল, সখিনা দেখতে পেল জয়নালের দুই হাতের তালুর চামড়া উঠে কাঁচা রক্ত বের হচ্ছে। রিকশার রডের ঘর্ষণে ফোস্কা গলে গিয়ে রক্তে ভিজে গেছে গামছাটা। সখিনা আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। সে জয়নালের রক্তাঙ্কিত হাত দুটো নিজের বুকের কাছে চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। জয়নাল মুচকি হেসে শান্ত গলায় বলল, "কান্দিস না সখিনা... পোলাডা দুধ পাইছে তো? দেখ, আরাফ একটু হাসতাছে।" এই সামান্য একটু হাসি, চালের গন্ধ আর বাচ্চার গায়ের ওম—তাদের সেই তিন হাত পলিথিনের অন্ধকার ঘরে যেন স্বর্গের শান্তি এনে দিল। কিন্তু সেই শান্তির স্থায়িত্ব যে কতটা ক্ষণস্থায়ী, তা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।
পাঠকের মনে প্রশ্ন?
সখিনা কি পারবে বস্তির অপমান সহ্য করে মানুষের বাসায় আয়ার কাজ শুরু করতে? জয়নালের রক্তাক্ত হাতের এই রিকশা চালানো দিয়ে কি মেটানো যাবে বাড়িওয়ালার হুমকি আর সংসারের ক্রমবর্ধমান দেনা? নাকি জীবনের মোড়ে অপেক্ষা করছে আরও কোনো নির্মম সত্য?

0 মন্তব্যসমূহ
কেমন লাগলো বা আপনার মতামত কমেন্ট করে জানান। গঠনমূলক যেকোনো মন্তব্য ও পরামর্শ সাদরে গ্রহণযোগ্য!