আকাশের রং কয়লার মতো গাঢ় ও অলক্ষণীয় কালো হয়ে আসছিল বিকেল নামার অনেক আগেই। ১৯৮৮ সালের ভাদ্র মাসের সেই স্যাঁতসেঁতে দিনটিতে বাতাসের মেটেলি ভেজা গন্ধের সঙ্গে কেমন যেন এক অবধারিত বিনাশের গন্ধ মিশে ছিল। মেঘনার শাখ নদীগুলোর উপচে পড়া থকথকে ঘোলা পানি ততক্ষণে গ্রামের উঁচা কাঁচা রাস্তাগুলোকেও গিলে ফেলেছে। জয়নাল মিয়ার ঘরের মাটির দাওয়ায় হাঁটুসমান পানির থইথই করছে। জয়নাল একটা পুরোনো তালকাঠের চালের খুঁটি শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল; তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আটকে ছিল উঠোনের শেষ সীমানায়, যেখানে তিন পুরুষ ধরে টিকে থাকা তাদের একমাত্র छনের চালার বাঁশের ঘরটি একটু একটু করে পানির তোড়ে ডেবে যাচ্ছিল। ঘরের বেড়ার বাঁশে শেওলা আর পলিমাটির ভারি আস্তরণে। মেহেরপুরের এই ছোট্ট শান্ত ভিটেটিতে কাল রাত পর্যন্ত যে জীবনের সহজ কোলাহল ছিল, আজ তা এক নিস্তব্ধ, রাক্ষুসে জলের সাম্রাজ্য। চোখের সামনে নিজের রক্তজল করা ভিটেমাটি তলিয়ে যেতে দেখার যন্ত্রণা কেবল সেই বোঝে, যার মাথার ওপরের আকাশটুকু ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উপরের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে কি যেন বলতে লাগলেন।
ঘরের ভেতর থেকে সখিনার চাপা গোঙানির মতো ব্যাকুল কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। সখিনা তার তিন বছরের নিষ্পাপ ছেলে আরাফকে বুকের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে জড়িয়ে ধরে এককোণে বাঁশের মাচানের ওপর বসে ছিল। আরাফের শরীরটা তীব্র জ্বরে একদম পুরে যাচ্ছিল, ছোট পুটুলির মতো শরীরটা থেকে থেমে থেমে এক অদ্ভুত কাঁপুনির শব্দ বের হচ্ছিল। বাচ্চার এই ধুঁকতে থাকা কচি শ্বাসকষ্ট সখিনার ভেতরের মাতৃসত্তাকে ছারখার করে দিচ্ছিল। সখিনার চোখের কোণে অশ্রু শুকিয়ে এক পলি জমা ছাপ তৈরি হয়েছে; ক্ষুধা, আতঙ্ক আর চরম অনিশ্চয়তা তাকে একদম বাকরুদ্ধ করে ফেলেছিল। বাইরের উন্মত্ত জলের গর্জনে তার ফিসফিস করে করা দোয়াগুলোও যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিল। জয়নাল একবার পেছনে ফিরে ঘরের ভেতরে সখিনা আর কোলের বাচ্চাটির দিকে তাকায়। পুরুষের নীরব আত্মসম্মান আর উপচে পড়া দায়িত্ববোধের ভারে তার শক্ত চোয়াল আরও শক্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু বুকের গহীনের অসহায়ত্ব তাকে কুঁকড়ে ফেলছিল। জয়নালের ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করার সময় এসে গেছে—যে মাটিতে তার বাপের কবর, যে উঠোনে সে প্রথম হাঁটতে শিখেছিল, তা আজ এক অচেনা নদীর তলদেশে। জয়নলা বুঝে উঠতে পারছে না এখন তার কি করনীয়।
গ্রামের বৃদ্ধ মোড়ল আব্দুর রব মিয়া যখন বাঁশের ভেলা ঠেলে জয়নালের প্লাবিত দাওয়ার কাছে এসে থামল, তখন চারপাশের বানের জলের তোড়ে কান পাতা দায়। "জয়নাল! আর এক মুহূর্ত দেরি করিস না ভাই! বাঁশের ব্রিজডা ভাইঙা ভেসে গেছে, ইউনিয়নের উঁচা বাঁধও আজ রাতের পানি সইতে পারবে না! চল, গাঁয়ের যা মানুষ বাইচা আছে, সবাই হাই স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে যাইতাছে!" আব্দুর রবের গলার স্বর বাতাসের গর্জনে কেঁপে উঠছিল। জয়নাল কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরপায়ে ঘরের হাঁটু পানিতে নেমে সখিনার বুক থেকে আধা-ভেজা কাঁথা জড়ানো আরাফকে কোলে তুলে নিল। আরাফের ছোট্ট কোমল হাত দুটো জয়নালের ছেঁড়া পুরোনো ফতুয়ার কলার কামড়ে ধরে রইল, যেন শিশুটি অবচেতনভাবেই বুঝতে পারছিল পৃথিবীর সমস্ত নির্ভরতা এখন এই মানুষটার শক্ত বুকের ওপরেই। সখিনা পিঠে একটা পুরোনো শাড়িতে বাঁধা চালের পুঁটুলিটা বেঁধে ভেলায় উঠল। ভিটেটি পেছনে ফেলে যখন ভেলাটি চলতে শুরু করল, জয়নাল একটিবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকায়নি। একবার তাকালেই হয়তো তার শক্ত বুকটা ভেঙে কান্নায় একাকার হয়ে যেত, যা সে এই ঘোর বিপদের মুহূর্তে স্ত্রীর সামনে প্রকাশ করতে চায়নি। জয়নাল নিজেকে ভিতর থেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু কেন যেন নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না।
স্কুলঘরের আশ্রয়কেন্দ্রটি ছিল যেন কোনো জীবন্ত নরকের ক্ষুদ্র সংস্করণ। শত শত মানুষের গাদাগাদি অবস্থান, গবাদিপশুর আর্তচিৎকার আর ভেজা কাপড়ের পচা দুর্গন্ধ মিলে বাতাস অসহ্য ভারী হয়ে উঠেছিল। চারিদিকে বিশুদ্ধ পানীয় জলের চরম সংকট, ডায়রিয়ার মারাত্মক আক্রমণ আর ক্ষুধার নির্মম থাবা পুরো সমাজকে এক অমানবিক পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছিল। ওপর দিয়ে যখন ত্রাণবাহী মিলিটারির হেলিকপ্টার উড়ে গিয়ে ওপর থেকে ত্রাণের প্যাকেট ফেলছিল, তখন শুকনো রুটির এক টুকরোর জন্য শত শত ক্ষুধার্ত মানুষের যে পশুর মতো হাহাকার—তা জয়নালের মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিত। জয়নাল কোনোদিন জীবনে কারও কাছে হাত পাতেনি, নিজের ঘাম বেঁচে একমুঠো ভাত খেয়েছে। অথচ আজ এই রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ তাকে নিঃস্ব করে এক টুকরো ত্রাণের লাইনে এনে দাঁড় করানোর উপক্রম করেছে। তিন দিন সেই নরকতুল্য আশ্রয়কেন্দ্রে কাটানোর পর যখন আশপাশের অসুস্থ মানুষের ভিড়ে আরাফের শ্বাসকষ্ট ডায়রিয়ার লক্ষণ নিয়ে আরও ভয়াবহ রূপ নিল, জয়নাল এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিল। এই তলিয়ে যাওয়া মরা গ্রামে বসে থাকলে বাচ্চাটা বিনা চিকিৎসায় মরে যাবে। জয়নাল চিন্তা করলো বিটে মাটির মায়া ত্যাগ করে সন্তানকে নিয়ে এমন জায়গায় যেতে হবে যেন সন্তানটিকে নিয়ে খেয়ে পড়ে বাঁচা যায়।
পরদিন ভোরে একটা মালবাহী কাদামাখা খোলা ট্রাকে করে জয়নাল, সখিনা আর অসুস্থ আরাফ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পুরো দেশ তখন এক মস্ত বড় জলাশয়, মহাসড়কের অর্ধেকের বেশি অংশ তোড়ে ভেঙে গেছে। ট্রাকের অনবরত ঝাঁকুনিতে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত অসুস্থ আরাফ কেঁদে উঠছিল বারবার, আর সখিনা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে বাচ্চার মুখটা ওপর থেকে পড়া বৃষ্টির জল থেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। জয়নাল ট্রাকের লোহার পাতের গায়ে হাত রেখে দূরের ধূসর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—ঢাকা নামের সেই অচেনা শহর কি তাদের মতো হতদরিদ্রদের ঠাঁই দেবে? যেখানে নিজের কোনো চাল-চুলা নেই, কোনো আত্মীয় নেই, সেখানে এই রোগাক্রান্ত বাচ্চা আর স্ত্রীকে নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবে সে? আশুলিয়ার বাঁধ ঘেঁষে সদ্য গড়ে ওঠা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন বস্তি এলাকার সীমানায় যখন তারা এসে পৌঁছাল, তখন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। চারিদিকে এক গা ছমছমে নিস্তব্ধতা, নর্দমার বিকট গন্ধ আর ইটভাটার ধোঁয়ায় ঢাকা আশুলিয়ার সেই পলিথিনের খুপরি ঘরে জয়নালদের প্রথম রাত শুরু হলো। অচেনা জায়গায় জয়নাল তার দিনগুলি কিভাবে পার করবে। স্ত্রী ও প্রিয় সন্তানকে কিভাবে ভরণ পুষণ দিবে। এসব চিন্তা করে জয়নালের বুকের ভিতর থেকে বড় পাথর যেন সরে যাচ্ছে বার বার।
বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ ছিল না। আশুলিয়ার ওই তিন হাত বাই চার হাতের বাঁশের কাঠি আর নোংরা পলিথিনের খুপরি ঘরটিতে মাটিতে ভেজা চট বিছিয়ে সখিনা নির্জীব আরাফকে কোলে নিয়ে শুয়ে পড়ল। চালের পলিথিনের ফুটো দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা নোংরা পানি ঠিক আরাফের তপ্ত কপালের ওপর পড়ছিল। সখিনা নিজের হাতের তালু দিয়ে বাচ্চার কপাল ঢেকে রাখল সারারাত। জয়নাল দরজার নামমাত্র প্লাস্টিকের চটের পর্দায় হেলান দিয়ে বাইরের নিশি অন্ধকারের দিকে তাকিয়েছিল। শহরের বিশাল ইট-কাঠের ভিড়ে এই পলিথিনের শেষ চৌকাঠে দাঁড়িয়ে জয়নালের মনে হচ্ছিল, তাদের অতীত, তাদের বংশের ইতিহাস নদী গিলে খেয়েছে। কিন্তু কোলের ওই আধমরা বাচ্চাটার দিকে তাকাতেই তার বুকের গহীনে এক অজানা জিদ্দি আগুনের সৃষ্টি হলো। যেকোনো মূল্যে এই বাচ্চাটাকে বাঁচাতে হবে, মানুষ করতে হবে। কিন্তু তারা জানত না, এই শহর রূপালী স্বপ্নের আলো দেখালেও তার আড়ালে থাকা শোষণের নিষ্ঠুর অন্ধকার তাদের জন্য আরও কত বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করে রেখেছে।
পাঠকের মনে প্রশ্ন:
আশুলিয়ার পলিথিনের খুপরি ঘরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত তিন বছরের ছোট আরাফ কি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে? নিঃস্ব জয়নাল কি পারবে অচেনা এই নিষ্ঠুর শহরে কাজের সন্ধান পেতে? আর সখিনাই বা কীভাবে সামলাবে তাদের এই নতুন জীবন?

0 মন্তব্যসমূহ
কেমন লাগলো বা আপনার মতামত কমেন্ট করে জানান। গঠনমূলক যেকোনো মন্তব্য ও পরামর্শ সাদরে গ্রহণযোগ্য!