শ্রাবণ শেষের নীল খাম

শ্রাবণ শেষের নীল খাম | অনিক ও রিয়ার ভালোবাসার গল্প

শ্রাবণ শেষের নীল খাম

একটি সত্যি গল্পের শেষহীন অপেক্ষা ও আত্মত্যাগের করুণ উপাখ্যান
লেখক: নাহিদ আমিন
রোমান্টিক ও ট্র্যাজেডি

১. নীল খামের নীরবতা

শহরের কোলাহল যখন ধীরে ধীরে থিতিয়ে আসে, ঠিক তখন অনিকের ঘরের এক কোণে জমে থাকা নির্জনতাটা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোটা জানালার গ্রিল ধরে টেবিলের ওপর এসে পড়েছে। টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কিছু পুরোনো বই, একটা বন্ধ ডায়েরি, আর একটা নীল রঙের খাম। খামটার ওপর স্পষ্টাক্ষরে লেখা—“অনিকের জন্য”।

অনিক তখন চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। তার হাতের চা ঠান্ডা হয়ে জমে গেছে অনেক আগেই। সে সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়াটুকু ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যেতে দেখছে। অনিক আগে এমন ছিল না, কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই সে নিজের অজান্তেই বদলে যাচ্ছে। বয়স খুব বেশি নয়, মাত্র ত্রিশের কোঠায় পা দিয়েছে; কিন্তু তার চোখের কোণে জমে থাকা বলিরেখা আর চোখের নিচের গাঢ় কালি বলে দেয়—ভেতরে ভেতরে একটা আস্ত জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে।

প্রায় তিন বছর হতে চলল রিয়া নেই। এই তিনটে বছর অনিকের জীবনের ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে, তা শুধু সেই জানে। প্রচণ্ড ভালোবাসার যন্ত্রণায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে সে। এখন আর কারো সাথে কথা বলে না, মিথ্যে আশ্বাসে বাঁচতেও পছন্দ করে না। তার জীবনটা যেন এক অনন্ত অন্ধকার সুরঙ্গ, যার কোনো শেষ নেই। ভালোবাসার মানুষটা হারিয়ে গেলে মানুষ কাঁদে, কিন্তু স্মৃতিগুলো যখন এভাবে শ্বাসরোধ করে ধরে, তখন কান্নাও শুকিয়ে যায়। রয়ে যায় শুধু এক অমানবিক শূন্যতা।

***

২. শুরুর দিনগুলো

ছয় বছর আগের কথা। অনিক তখন একটা মধ্যবিত্ত বেসরকারি সংস্থায় সবেমাত্র চাকরি পেয়েছে। বেতন আহামরি কিছু নয়, তবে অল্প টাকার মধ্যেও জীবনটা হাসি, আনন্দ আর আড্ডায় একরকম কেটে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় তার জীবনে আগমন ঘটে রিয়ার। রিয়া ছিল অনিকের চেয়ে চার বছরের ছোট, একই ভার্সিটিতে পড়ত। রিয়ার চোখের দিকে তাকালে মনে হতো যেন সমুদ্রের সব শান্ত জল সেখানে এসে জমা হয়েছে। চঞ্চল, প্রাণবন্ত এবং সবসময় ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে থাকা একটি মেয়ে। রিয়াকে দেখলে যে কারো মুহূর্তের মধ্যে ভালো লেগে যাওয়ার কথা।

তাদের পরিচয়টা হয়েছিল খুব সাধারণভাবেই—একটা সাধারণ বাস স্টপেজে, বৃষ্টিভেজা এক বিকেলে। রিয়া ছাতা আনতে ভুলে গিয়েছিল, আর অনিকের কাছে ছিল একটি পুরোনো নীল ছাতা। অনিক নিজের অর্ধেক ভিজে রিয়াকে ছাতার নিচে জায়গা দেয়। রিয়া কাঁপাকাঁপা গলায় বলেছিল, "আপনার তো একপাশ ভিজে শেষ! ভালোবাসার মানুষকে এভাবে আগলে রাখা যায়, ছাতা তো দুজন মানুষকে বাঁচাতে পারে না।"

অনিক সেদিন শুধু একটু হেসেছিল। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, ওই বৃষ্টিভেজা বিকেলটাই তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেবে। ধীরে ধীরে পরিচয় বন্ধুত্বে এবং বন্ধুত্ব একসময় গভীর ভালোবাসায় রূপ নেয়। অনিক আর রিয়া—দুজন দুজনের পরিপূরক হয়ে ওঠে। ভিক্টোরিয়ার মোড়, গঙ্গার ঘাট, আর চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো গল্পগুলো ছিল তাদের নিজস্ব জগৎ। অনিকের সামান্য আয়ে কোনো রাজকীয় বিলাসিতা ছিল না, কিন্তু ছিল অপরিসীম আন্তরিকতা। রিয়াও কখনো অনিকের কাছে বড় কোনো দাবি করেনি। তার চাওয়া ছিল শুধু অনিকের একটুখানি সান্নিধ্য আর ভালোবাসার উষ্ণতা।

এক সন্ধ্যায় গঙ্গার ঘাটে বসে রিয়া অনিকের কাঁধে মাথা রেখে বলেছিল, "অনিক, যদি কোনোদিন আমি হঠাৎ হারিয়ে যাই, তুমি কী করবে?"

অনিক রিয়ার চিবুক ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলেছিল, "পাগল হয়েছ? তুমি ছাড়া আমার আর আছেই বা কে? তোমাকে ছাড়া বাঁচার কথা আমি ভাবতেও পারি না।"

রিয়া রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে বলেছিল, "মানুষের ভাগ্য বড় অদ্ভুত অনিক! যেটাকে আমরা সবথেকে বেশি আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই, সময় অনেক সময় সেটাই সবার আগে কেড়ে নেয়।"

অনিক সেদিন রিয়ার কথার গূঢ় অর্থ বুঝতে পারেনি। সে ভেবেছিল এটা হয়তো রিয়ার কোনো আবেগী নাটকীয়তা। কিন্তু নিয়তি যে নেপথ্যে নিজের নির্মম খেলা সাজাচ্ছিল, তা অনিক একটুও টের পায়নি।

***

৩. ঝড়ের পূর্বাভাস

সম্পর্কের তৃতীয় বছরে এসে হঠাৎ করেই রিয়ার ব্যবহারে কিছু পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যে রিয়া দিনে দশবার ফোন করে অনিকের খোঁজ নিত, সে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন বন্ধ রাখে। দেখা করতে চাইলে নানা অজুহাত দেখায়। অনিকের মনে সংশয় জাগে—তবে কি রিয়া তাকে এড়িয়ে চলছে? তবে কি তাদের এই সাধারণ মধ্যবিত্ত প্রেমে রিয়ার মন ভরে গেছে?

একদিন অনিক বাধ্য হয়ে রিয়ার কলেজের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রিয়া যখন বের হয়, অনিক তার হাত ধরে টেনে একপাশে নিয়ে যায়।

"কী হয়েছে রিয়া? তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছ কেন? আমি কি কোনো ভুল করেছি?"— অনিকের কণ্ঠে ছিল আকুলতা।

রিয়া চোখ তুলে অনিকের দিকে তাকায়। সেই চোখে কোনো ছলছল ভাব ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত বরফশীতল ভাব। রিয়া ঠান্ডা গলায় বলে, "অনিক, আমাদের আর দেখা করা উচিত নয়। আমি আর এই সম্পর্কটা টেনে নিয়ে যেতে পারছি না।"

অনিক যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। "মানে? কী বলছ তুমি রিয়া? আমাদের এতদিনের ভালোবাসা, এত স্মৃতি—সব কি একদিনে মিথ্যা হয়ে গেল?"

"বাস্তবতা মেনে নাও অনিক। ভালোবাসা দিয়ে পেট চলে না। আমার পরিবার আমার জন্য অন্য জায়গায় সম্বন্ধ দেখছে। ছেলে প্রতিষ্ঠিত, বড় চাকরি করে। আমি তোমার সাথে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে পা বাড়াতে পারব না।"— কথাগুলো বলেই রিয়া অনিকের দিকে আর না তাকিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে যায়।

অনিক সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন তার পায়ের নিচের মাটি ধসে গেছে। বুকে একটা প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয়, যা প্রকাশ করার মতো ভাষা তার জানা ছিল না। অনিক নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, বুঝতেও পারছিল না হঠাৎ রিয়া এমন কেন করছে।

***

৪. অন্ধকারের দিনগুলো

রিয়ার চলে যাওয়ার পর অনিক ভেঙে পড়েছিল সম্পূর্ণভাবে। অফিসে কাজে ভুল হতো, রাতে ঘুম হতো না। সারারাত ঘরের মেঝেতে বসে রট আয়রনের গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকত। সন্ধ্যার পর একাকীত্বের যন্ত্রণা আরও তীব্র হতো। সারারাত রিয়ার কথা ভেবে কাঁদত।

মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন—যে রিয়া তাকে এক মুহূর্ত না দেখে থাকতে পারত না, সে কীভাবে এত নিষ্ঠুর হয়ে গেল? অর্থ আর প্রতিপত্তি কি ভালোবাসার চেয়েও বড় হয়ে উঠল?

অনিক রিয়াকে অনেকবার ফোন করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু নম্বরটা ব্লকলিস্টে ছিল। তার বন্ধুবান্ধবদের কাছে খোঁজ নিয়েও কোনো লাভ হয়নি; সবাই বলেছিল রিয়া নাকি পড়াশোনা ছেড়ে শহর ছেড়ে চলে গেছে।

অনিক নিজেকে বুঝিয়েছিল, ভালোবাসায় জোর চলে না। রিয়া যদি সুখী হতে চায়, তবে তার সুখী হওয়াই ভালো। অনিক নিজের যন্ত্রণাকে বুকের গভীরে চেপে রেখে দিন যাপন করতে শুরু করল। কিন্তু ভেতরের মানুষটা যে ততদিনে মরে কাঠ হয়ে গেছে, তা বাইরে থেকে কেউ বুঝতে পারত না। এভাবে কেটে যায় দুটো দীর্ঘ বছর। জীবনের ছন্দ হারিয়ে গিয়েছিল, শুধু বেঁচে থাকার খাতিরে বেঁচে থাকা।

***

৫. মর্মান্তিক সত্যের মুখোমুখি

হঠাৎ একদিন সকালে অনিকের ফোনে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। অন্য পাশ থেকে এক প্রবীণ কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, "আপনি কি অনিক বলছেন?"

"হ্যাঁ, বলছি। আপনি কে?"

"আমি রিয়ার বাবা বলছি..."

রিয়ার বাবার নাম শুনে অনিকের বুকের ভেতরটা ছাৎ করে ওঠে। পুরোনো ক্ষতটা যেন আবার নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু করে।

"অনিক, তুমি কি একবার আমাদের বাড়িতে আসতে পারবে? রিয়ার কিছু জিনিস আছে, যা ও তোমাকে দিতে বলে গেছে।"— রিয়ার বাবার গলা কাঁপছিল, তিনি কান্নার তোড়ে কথা শেষ করতে পারছিলেন না।

অনিকের মাথায় তখন হাজারটা চিন্তা। রিয়া কেন তাকে জিনিস পাঠাবে? সে তো এখন বিবাহিতা, হয়তো অন্য কারও সংসার করছে। তবুও এক অদ্ভুত টান অনিককে বাধ্য করে রিয়ার বাড়ি যেতে।

রিয়াদের বাড়িতে পৌঁছানোর পর অনিক যে দৃশ্য দেখে, তার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। বাড়ির বসার ঘরে রিয়ার একটি বড় ছবি টাঙানো, আর তার সামনে সাদা ফুলের মালা ঝুলছে। পাশে একটা প্রদীপ জ্বলছে। অনিক থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার চোখের সামনে পুরো ঘরটা ঘুরতে থাকে।

রিয়ার বাবা এসে অনিকের পাশে দাঁড়ান। বৃদ্ধ মানুষটার চোখ দুটি লাল, চেহারায় গভীর শোকের ছাপ। অনিক কোনোমতে গলা পরিষ্কার করে বলল, "কাকাবাবু... এসব কী? রিয়া কোথায়?"

রিয়ার বাবা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। "রিয়া আর নেই অনিক। আজ থেকে ঠিক এক মাস আগে ও আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে।"

অনিকের মনে হলো তার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। সে বাকরুদ্ধ হয়ে রিয়ার ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। রিয়া নেই? এ কীভাবে সম্ভব?

রিয়ার বাবা অনিকের হাত ধরে সোফায় বসালেন। তারপর যা বললেন, তা শুনে অনিকের বুকের ভেতরের পৃথিবীটা তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে গেল।

***

৬. ভালোবাসার আত্মত্যাগ

রিয়া কোনোদিন অনিককে প্রতারণা করেনি। রিয়া যখন অনিককে ছেড়ে যাওয়ার অভিনয় করেছিল, ঠিক তার দুই সপ্তাহ আগে জানতে পারে সে এক মারণ রোগে আক্রান্ত—‘অ্যাডভান্সড স্টেজ লিউকেমিয়া’ (ব্লাড ক্যান্সার)। ডাক্তাররা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, রিয়ার হাতে আর বেশি সময় নেই। বাঁচানো প্রায় অসম্ভব।

রিয়া জানত, অনিক তাকে কতটা ভালোবাসে। যদি অনিক এই সত্য জানতে পারত, তবে সে নিজেকে শেষ করে দিত। অনিক তার চিকিৎসার জন্য নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে দিত, তাও হয়তো তাকে বাঁচাতে পারত না। রিয়া চায়নি অনিক তার মৃত্যুর যন্ত্রণা প্রতিদিন তিলে তিলে অনুভব করুক। সে চায়নি অনিক এক জীবন্ত লাশের মতো তার হাসপাতালের বেডের পাশে বসে থাকুক।

তাই রিয়া বেছে নিয়েছিল এক কঠিন আর নির্মম পথ—অনিকের চোখে নিজেকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া। যাতে অনিক তাকে ঘৃণা করে, আর ঘৃণা মানুষকে ভালোবাসার চেয়ে দ্রুত ভুলে যেতে সাহায্য করে। রিয়া চেয়েছিল অনিক তাকে প্রতারক ভেবে ভুলে যাক এবং নিজের জীবনে এগিয়ে যাক।

বিগত দুই বছর ধরে রিয়া এক অসহ্য যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে। কেমোথেরাপির যন্ত্রণায় যখন তার শরীর ভেঙে পড়ত, যখন মাথার সব চুল ঝরে গিয়েছিল, তখন সে শুধু অনিকের একটা ছবি বুকে চেপে ধরে কান্নাকাটি করত। প্রতিটি রাতে সে যন্ত্রণায় ছটফট করত আর অনিকের নাম জপ করত। কিন্তু কোনোদিন অনিককে জানতে দেয়নি।

রিয়ার বাবা অনিকের হাতে একটি নীল খাম আর একটা পুরোনো ডায়েরি তুলে দিয়ে বললেন, "মেয়েটা মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শুধু তোমার নামটাই ডেকে গেছে অনিক। ও বলে গেছে, 'বাবা, আমি মরে যাওয়ার পর অনিককে এই চিঠিটা দিও। তার আগে নয়। ও যেন জানে, আমি কোনোদিন অন্য কারও হইনি। আমি শুধু ওর ছিলাম, আর ওর হয়েই চলে গেলাম।'"

✉

৭. শেষ চিঠি ও বেঁচে থাকার যন্ত্রণা

অনিক চিঠিটা হাতে নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে আসে। সেই চিঠিটাই এখন তার টেবিলে পড়ে আছে। অনিকের কাঁপন ধরা হাত দুটো খামটা খোলে। ভেতরে রিয়ার স্পষ্ট কিন্তু শেষদিকের দুর্বল হাতের লেখায় লেখা একটি চিঠি:

"প্রিয় অনিক,

যদি তুমি এই চিঠিটা পড়ে থাকো, তবে বুঝে নিও আমি আর এই পৃথিবীতে নেই। আমি জানি, তুমি আমাকে ঘৃণা করতে। তুমি ভাবতে আমি টাকার লোভে তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি। অনিক, আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমাকে মিথ্যে বলার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না, কিন্তু আমি বাধ্য ছিলাম।

তুমি তো জানতে, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসতাম। তোমাকে তিলে তিলে শেষ হতে দেখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমার ক্যান্সারের খবর শুনলে তুমি নিজেকে শেষ করে দিতে। আমি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে ঘৃণা করো। কারণ ভালোবাসার মানুষকে হারানোর কষ্টের চেয়ে, তাকে ঘৃণা করে ভুলে থাকা অনেক সহজ।

কিন্তু আমি হেরে গেছি অনিক। তোমাকে ভোলা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের বেডে শুয়ে প্রতিটি মুহূর্তে আমি তোমার ছাতা ধরার কথা মনে করেছি, সেই চা খাওয়ার দিনগুলোর কথা ভেবেছি। তোমার নীল ছাতাটা আজও আমার কাছে আছে। আমি জানি, আমি তোমার সাথে অন্যায় করেছি। তুমি হয়তো আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না।

তবে একটা অনুরোধ রইল অনিক, আমার জন্য নিজের জীবনটাকে থামিয়ে দিও না। তুমি বাঁচবে, আমার ভালোবাসাকে বুকে ধরে বাঁচবে। তুমি ভালো থাকলেই আমার আত্মা শান্তি পাবে। আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি শুধু তোমাকেই ভালোবেসে গেছি।

চিঠিটা পড়ে শেষ করার পর অনিকের চোখ দিয়ে একবিন্দু জলও গড়িয়ে পড়ল না। তার ভেতরের সমস্ত কান্না যেন পাথরে পরিণত হয়ে গেছে।

অনিক জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ছয় বছর আগের সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের কথা তার মনে পড়ে যায়। রিয়া চেয়েছিল অনিক যেন তাকে ঘৃণা করে ভুলে যায়, কিন্তু নিয়তি অনিককে এমন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল, যেখানে ঘৃণাও নেই, আবার ভুলে থাকার কোনো উপায়ও নেই।

রয়ে গেল শুধু এক সীমাহীন অপরাধবোধ আর অনন্ত কষ্ট—যা অনিককে সারাজীবন তিলে তিলে দগ্ধ করবে। রিয়া চলে গিয়েও অনিককে এমন এক ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধে দিয়ে গেল, যা মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

অনিক জানালার বাইরে হাত বাড়ায়। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার হাতের তালুতে এসে পড়ে। সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে, "তুমি জিতে গেলে রিয়া... কিন্তু আমাকে সারাজীবনের জন্য এক নির্মম শাস্তির মধ্যে ফেলে রেখে গেলে। আমি তোমাকে ঘৃণাও করতে পারলাম না, আর ভুলে তো কোনোদিনই থাকতে পারব না।"

রাতের নীরবতা চিরে শুধু বৃষ্টির শব্দ হতে থাকে, আর ঘরের কোণে বসে থাকা এক নিঃসঙ্গ পুরুষ নিজের ভালোবাসার ধ্বংসাবশেষ আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার নতুন এক যন্ত্রণাদায়ক যুদ্ধ শুরু করে।

— গল্প সমাপ্ত —
লেখা: নাহিদ আমিন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ