শেষ আলিঙ্গন
শহরের কোলাহলপূর্ণ সকালে নীলিমা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটা পুরোনো চিঠি, খামটা হলদেটে হয়ে গেছে সময়ের স্পর্শে। সাত বছর হয়ে গেল প্রিয়মের চলে যাওয়ার। ক্যান্সার নামক নীরব শত্রু তাকে কেড়ে নিয়েছিল মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে। নীলিমার চোখের কোণে জল জমল, কিন্তু সে সেটা মুছে ফেলল। এখন আর কান্না আসে না, কেবল একটা ফাঁকা অনুভূতি।
রূপালী ব্যাংকে চাকরি করে নীলিমা। প্রতিদিন সকাল সাতটায় বেরোয়, রাত আটটায় ফেরে। জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় সংখ্যার খাতায়, গ্রাহকের হাসিমুখে, সহকর্মীদের আড্ডায়। অফিসে কর্মব্যস্ততার মধ্যে অবশ্য নীলিমার দিনটা ভালই যায়। কিন্তু বাড়ি ফিরে এসে সেই শূন্যতা তাকে গ্রাস করে। প্রিয়মের ছবি, তার হাসি, তার কথা, তার সাথে কাটানো মুহূর্ত—সবকিছু যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য হয়ে গেছে।
আজ শনিবার। নীলিমা অফিসে যাবে না। সে ঠিক করল প্রিয়মের জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলবে। অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সাহস হয়নি। আজ চেষ্টা করে দেখবে।
ঘরের একটা কোণায় প্রিয়মের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেখানে প্রিয়মের প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র রাখা। প্রিয়মের জিনিস কখনো এলোমেলো করতে সাহস হয়নি নীলিমার। কিছু জিনিস তার অনেক শখের এবং যত্নের ছিল। সময়ের কী করুণ পরিণতি! আজ প্রিয়ম নেই, তার জিনিসগুলো এলোমেলো পড়ে আছে ধুলোয়, ময়লা লাগা। নীলিমা কর্মব্যস্ততার কারণে ঠিকমতো সময় দিয়ে গুছিয়ে উঠতে পারেনি, তার মধ্যে আবার তার শরীরের অবস্থা বেশি একটা ভালো নেই। আজ মনে অনেক সাহস নিয়ে প্রিয়মের জিনিসগুলি গোছানোর চেষ্টা করছে।
আলমারির এক কোণায় প্রিয়মের পুরোনো ডায়েরি খুঁজে পেল। খাতাটা বেশ মোটা, নীল রঙের কভার। নীলিমা জানত না প্রিয়ম ডায়েরি লিখত। সে আগ্রহ নিয়ে খুলল। প্রথম পাতায় লেখা:
নীলিমার হাত কাঁপতে লাগল। সাত বছর পর প্রিয়ম যেন আবার কথা বলছে তার সাথে। নীলিমা আস্তে আস্তে ডায়েরির পাতাগুলি উল্টিয়ে উল্টিয়ে পড়তে লাগল।
ডায়েরিতে প্রতিদিনের বর্ণনা। প্রথম দিকে ছিল আশা-ভরসার কথা। ডাক্তার বলেছিলেন রোগ নির্ণয়ের সময়, কিন্তু প্রিয়ম লিখেছিল, "আমি যুদ্ধ করব। নীলিমার জন্য, আমাদের ভালোবাসার জন্য।"
নীলিমা পড়তে থাকল। প্রিয়ম লিখেছিল কেমোথেরাপির যন্ত্রণার কথা, চুল পড়ার কথা, দিন দিন কষ্টে থেকে ভিতরে ভিতরে যন্ত্রণা পোহানোর কথা; কিন্তু সব সময়ই একটা আশার সুর। "আজ নীলিমা আমার জন্য মাছের ঝোল রান্না করেছে। আমি খেতে পারিনি, কিন্তু তার মুখ দেখে আমার ভালো লাগল।"
ডায়েরির মাঝামাঝিতে এল এক অদ্ভুত পৃষ্ঠা। প্রিয়ম লিখেছিল, "নীলিমাকে আমি একটা গোপন কথা জানাইনি। আমাদের বিয়ের আগে আমি আরেকজনকে ভালোবেসেছিলাম। তার নাম তনু। কিন্তু সেটা ছিল কৈশোরের আবেগ। ছোট সময় একসাথে একই স্কুলে পড়াশোনা করেছি, আড্ডা দিয়েছি, সেখান থেকে তনুকে ভালো লাগত। নীলিমার সাথে পরিচয়ের পর আমি বুঝলাম সত্যিকারের ভালোবাসা কী। তবুও আমি তনুকে একদিন বলেছিলাম, যদি কখনো আমার কিছু হয়, তাহলে সে যেন নীলিমার খবর রাখে। আজ তনু ফোন করল। জানতে চাইল কীভাবে আছে নীলিমা। আমি বললাম ভালো আছে। কিন্তু মিথ্যে বললাম। আমি জানি নীলিমা কষ্ট পায়।"
নীলিমা ডায়েরি বন্ধ করে দিল। তার মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রিয়মের আরেকজনকে ভালোবাসার কথা? তার কাছে তো কখনো বলেনি! আর এই তনু কে? সে তো নামটাও শোনেনি। তনুর কথা প্রিয়মের ডায়েরিতে লেখা দেখে নীলিমার চোখে পানি চলে আসলো এবং তার একাকীত্ব আরো বেড়ে গেল। শূন্যতা যেন এক মুহূর্তে নীলিমাকে কুরে কুরে খাওয়া শুরু করেছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে ডায়েরি আবার খুলল। আরও পড়তে থাকল।
নীলিমার মনের মধ্যে এখন কয়েকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। নীলিমার গলা শুকিয়ে গেল। প্রিয়ম তাকে ভালোবাসত, সেটা সে জানত। কিন্তু এই গোপনীয়তা? তনু? তার মনে হলো সে প্রিয়মকে চেনে না।
ডায়েরির শেষ দিকে এল। কয়েক পৃষ্ঠা পরে লেখা: "আমি এখন দুর্বল। কথা বলতে পারি না। কিন্তু একটা কাজ করতে পারি। তনুকে বলেছি, আমার মৃত্যুর পর যেন সে নীলিমার সাথে যোগাযোগ করে। বলেছি, আমি চাই নীলিমা সুখী হোক। আমার জন্য নয়, নিজের জন্য।"
নীলিমা ডায়েরি শেষ করল। তার ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি। রাগ, কষ্ট, ভালোবাসা, অবিশ্বাস—সবকিছু মিশে গেছে। সে ডায়েরি রেখে রান্নাঘরে গেল। চা বানাতে বানাতে ভাবল—তনুকে ফোন করবে? কিন্তু তনুর সাথে যোগাযোগ করবে কীভাবে বা তার নম্বরটাই বা কোথায় পাবে? এসব ভাবতে ভাবতে নীলিমার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর। নীলিমা সেটা তুলল। "হ্যালো? নীলিমা?"
"হ্যাঁ, কে বলছেন?"
"আমি তনু। প্রিয়মের বন্ধু। আমি জানি এটা অদ্ভুত লাগছে, কিন্তু প্রিয়মের একটা অনুরোধ ছিল। সে চেয়েছিল তার মৃত্যুর সাত বছর পর আমি তোমার সাথে দেখা করি। আজ সাত বছর পূর্ণ হলো।"
নীলিমার গলা বন্ধ হয়ে এল। মুখে একটাও কথা বের হচ্ছে না, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, "কীভাবে পেলেন আমার নম্বর?"
"প্রিয়ম আমাকে দিয়ে গিয়েছিল। একটা চিঠি দিয়ে গিয়েছিল তোমার জন্য। চিঠিটা আমার কাছে আছে।"
নীলিমা কিছু বলতে পারল না। ফোনে নীরবতা। "আমি কি আসতে পারি? এখনই?" তনু জিজ্ঞেস করল। নীলিমা আসার জন্য বললেন এবং তার ঠিকানা বলে দিলেন।
তনু এল এক ঘণ্টা পরে। সে দেখতে মোটামুটি নীলিমার মতোই, কিন্তু চোখে আলাদা একটা উজ্জ্বলতা। হাতে একটা খাম। বসার পর তনু চিঠিটা দিল। "প্রিয়ম লিখেছিল, সাত বছর পর পড়তে।"
নীলিমা খোলার আগেই বলল, "আমি তার ডায়েরি পড়েছি। আজ সকালে।"
তনু চমকে উঠল। "ডায়েরি? সে তো বলেছিল..."
"হ্যাঁ, সেখানে তোমার কথা আছে।"
তনু একটু নিচু হলো। "আমি প্রিয়মের স্কুলবন্ধু ছিলাম। কৈশোরে আমরা একে অপরকে ভালোবাসতাম। কিন্তু সেটা ছিল খেলার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ও নীলিমাকে পেল। ও আমাকে বলেছিল, এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা।"
নীলিমা চিঠি খুলল। প্রিয়মের হাতের লেখা, কাঁপা কাঁপা অক্ষর:
"প্রিয় নীলিমা,
যদি এই চিঠি পড়ো, তবে বুঝো আমি চলে গেছি। আমার একটা অনুরোধ। তুমি জানো আমি তোমাকে কত ভালোবাসতাম। কিন্তু ভালোবাসা মানে কি শুধু থাকা? না। ভালোবাসা মানে চলে যাওয়ার পরেও কাউকে সুখী রাখা। আমি চাই তুমি আবার বাঁচো। তনুকে আমি বলেছি তোমার সাথে দেখা করতে। সে ভালো মেয়ে। ওর সাথে বন্ধুত্ব করো। হয়তো ওর মাধ্যমেই তুমি নতুন কিছু পাবে।
আমার শেষ ইচ্ছা—তুমি সুখী হও। আমার জন্য নয়, নিজের জন্য। আমি সবসময় তোমার সাথে আছি, তোমার মনে।
চিরকাল তোমার,
প্রিয়ম"
নীলিমা চিঠি পড়ে শেষ করল। চোখের জল আটকাতে পারল না। তনু কাছে এসে তার হাত ধরে রাখল। নীলিমা এখন চিৎকার করে কান্না করছে। তনুর চোখেও পানি জমে আছে।
"প্রিয়ম আমাকে বলেছিল, তুমি একা থাকবে। সে চেয়েছিল আমি তোমার বন্ধু হই। কিন্তু সে জানত না আমি নিজেও তোমাকে ভালোবাসতে পারি। আজ সাত বছর আমি তোমার খবর রাখতাম। তোমার ছবি দেখতাম, খবর পড়তাম—তুমি কীভাবে কাটাচ্ছ জীবন।"
নীলিমা তাকিয়ে রইল তনুর দিকে। এত বছর পর এই অপরিচিত মহিলা তার সামনে, প্রিয়মের হাত ধরে। সে বুঝতে পারল প্রিয়ম আসলে কী করতে চেয়েছিল। শেষ আলিঙ্গন—যেটা ছিল তার ভালোবাসার শেষ উপহার। যে আলিঙ্গনে সে নীলিমাকে ছেড়ে দিচ্ছে, কিন্তু নতুনভাবে বাঁচার পথ দেখাচ্ছে।
নীলিমা হেসে উঠল। সাত বছর পর প্রথমবার। সে তনুকে বলল, "চলো, আমি চা বানাই।"
তারা দুজন রান্নাঘরে গেল। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ল। নীলিমা ভাবল—হয়তো প্রিয়ম ঠিকই ছিল। ভালোবাসা মানে শেষ নয়, নতুন শুরু। সেদিনের শেষ আলিঙ্গন ছিল আসলে নতুন যাত্রার শুরু। প্রিয়ম চলে গিয়েছিল, কিন্তু সে রেখে গিয়েছিল এক অপার্থিব বন্ধন—নীলিমা আর তনুর মধ্যে।
রান্নাঘরে চায়ের কাপ দুই হাতে, তারা দুজন হাসল। প্রিয়মের আত্মা হয়তো আজ শান্তি পেল। নীলিমা বুঝল—মৃত্যু শেষ নয়, ভালোবাসা অনন্ত।


0 মন্তব্যসমূহ
কেমন লাগলো বা আপনার মতামত কমেন্ট করে জানান। গঠনমূলক যেকোনো মন্তব্য ও পরামর্শ সাদরে গ্রহণযোগ্য!