রক্তে ভেজা স্বপ্ন


              চট্টগ্রাম বন্দর নগরীর কর্ণফুলী নদীর পাড়ে সন্ধ্যা নামলে যে আলো জ্বলে ওঠে, তার একটা আলাদা রং আছে। সেই আলোয় কত মানুষের স্বপ্ন পোড়ে, কত মানুষের স্বপ্ন গড়ে ওঠে, তার হিসাব কেউ রাখে না। এই গল্পটা তেমনই একজন মানুষের, যে জন্ম নিয়েছিল সোনার চামচ মুখে, বড় হয়েছিল আকাশছোঁয়া প্রাসাদে, তারপর একদিন হারিয়ে গিয়েছিল রাস্তার ধুলোয়। আবার সেই ধুলো থেকেই সে উঠে দাঁড়িয়েছিল, সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে, নিজের রক্ত আর ঘাম দিয়ে নতুন একটা জীবন গড়েছিল। তার নাম রাহাত চৌধুরী। এই গল্প তার পতনের, তার কষ্টের, তার ভালোবাসার, আর শেষমেশ তার ফিরে আসার।

        চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শিল্পপতিদের একজন ছিলেন আফতাব চৌধুরী। পোশাক রপ্তানি আর জাহাজ ভাঙার ব্যবসায় তার নাম ছিল পুরো দেশজুড়ে সমাদৃত। বারো বছরের বিবাহিত জীবনে সন্তানের মুখ দেখার জন্য তিনি আর তার স্ত্রী নাজনিন বেগম কম কাঠখড় পোড়াননি। দেশ বিদেশের কত ডাক্তার দেখিয়েছেন, কত মানত করেছেন, তার হিসাব নেই। শেষমেশ যেদিন হাসপাতালের নার্স এসে বলল ছেলে হয়েছে, আফতাব চৌধুরী কাঁদতে কাঁদতে পুরো হাসপাতালের কর্মচারীদের মিষ্টি খাইয়েছিলেন। সেই ছেলের নাম রাখা হলো রাহাত, যার অর্থ শান্তি। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর রসিকতা, এই শান্তির নামে জন্ম নেওয়া ছেলেটাই একদিন গোটা পরিবারের জীবনে ঝড় বইয়ে দেবে, তা সেদিন কেউ জানত না।

        রাহাতের জন্মের পর থেকেই বাড়িতে তার জন্য আলাদা একটা জগত তৈরি হয়ে গেল। ফয়েজলেক পাহাড়ের ঢালে তৈরি তিনতলা প্রাসাদোপম বাড়িতে ছিল বারোজন কাজের লোক, তিনজন ড্রাইভার, একজন বাবুর্চি যিনি শুধু রাহাতের পছন্দের খাবার রান্না করার জন্যই নিয়োজিত ছিলেন। জন্মদিনে হেলিকপ্টার থেকে বেলুন ফেলা হতো, ছয় বছর বয়সেই তার নিজস্ব একটা ছোট গাড়ি ছিল যেটাতে সে বাগানে ঘুরে বেড়াত। প্রতিবেশীরা রসিকতা করে বলত, চৌধুরী বাড়ির ছেলের পায়ের নিচে মাটি নেই, পায়ের নিচে টাকা।

        মা নাজনিন বেগম মাঝে মাঝে চিন্তিত হতেন। তিনি স্বামীকে বলতেন, এত আদর ভালো না, ছেলেটা বড় হয়ে বিগড়ে যাবে। আফতাব চৌধুরী হাসতে হাসতে উড়িয়ে দিতেন কথাটা। তিনি বলতেন, আমি নিজে গরিব ঘর থেকে উঠে এসেছি, আমার ছেলে কষ্ট পাবে কেন। আমি সারাজীবন কষ্ট করেছি যাতে আমার ছেলের কোনো কষ্ট না হয়। এই একটা কথাই তিনি বারবার বলতেন, বুঝতে পারেননি যে সন্তানকে সব দিয়ে দেওয়া আর সন্তানকে মানুষ করা দুটো আলাদা জিনিস। ব্যবসার কাজে তিনি এত ব্যস্ত থাকতেন যে ছেলের সাথে বসে দুদণ্ড কথা বলার সময়ও তার হতো না, সেই ফাঁক পূরণ করতেন দামি খেলনা আর নগদ টাকা দিয়ে।

        স্কুলজীবনে রাহাত ভর্তি হলো শহরের সবচেয়ে নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। প্রতিদিন গাড়িতে চড়ে স্কুলে যেত, সাথে থাকত দেহরক্ষী। ক্লাসের বন্ধুরা তার চারপাশে ঘুরঘুর করত, কারণ রাহাতের কাছে সবসময় প্রচুর পকেট মানি থাকত, আর সে অকাতরে খরচ করত। শিক্ষকরাও তাকে বিশেষ চোখে দেখতেন, কারণ চৌধুরী সাহেব স্কুলের বড় অনুদানদাতা। পরীক্ষায় খারাপ করলেও শিক্ষকরা নম্বর একটু বাড়িয়ে দিতেন, এটাই ছিল অলিখিত নিয়ম। এভাবে রাহাত শিখল যে টাকা দিয়ে সবকিছু কেনা যায়, এমনকি সত্যিটাও।

        এখানে একটা তথ্য জেনে রাখা ভালো, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প তখন দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় আশি শতাংশের বেশি জোগান দিত, আর এই শিল্পে কাজ করা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের অধিকাংশই ছিলেন নারী, যারা মাসে অল্প বেতনে দিনে বারো তেরো ঘণ্টা কাজ করতেন কারখানায়। আফতাব চৌধুরীর কারখানাতেও এমন হাজার তিনেক শ্রমিক কাজ করতেন, যাদের ঘামে গড়ে উঠেছিল সেই প্রাসাদ, যেখানে বসে ছোট্ট রাহাত রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি দিয়ে খেলত। এই বৈপরীত্যটা তখন কারো চোখে পড়ত না, কিন্তু গল্পের শেষে এই সত্যটাই বড় হয়ে দেখা দেবে।

        ক্লাস নাইনে ওঠার পর রাহাতের জীবনে নতুন একদল বন্ধু জুটল, যারা শহরের অন্যান্য বড়লোক বাবার সন্তান। তাদের একটাই কাজ ছিল, বিকেল হলেই শহরের অভিজাত ক্লাবে জড়ো হওয়া, দামি বাইক নিয়ে রেস করা, আর রাত গভীর হলে বাড়ি ফেরা। রাহাতও ধীরে ধীরে সেই দলে ভিড়ে গেল। প্রথম প্রথম শুধু আড্ডা আর গান বাজনা ছিল, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেই আড্ডায় ঢুকে পড়ল সিগারেট, তারপর মদ। পনেরো বছর বয়সে প্রথমবার মদ্যপান করে রাহাত এমন হুলুস্থুল কাণ্ড বাধিয়েছিল যে ক্লাবের সবাই সেই গল্প মাসখানেক ধরে বলাবলি করেছিল। সে ক্লাবের সুইমিং পুলে জামাকাপড় পরেই লাফিয়ে পড়ে চিৎকার করে গান গাইছিল, আর তার বন্ধুরা হাসতে হাসতে সেই দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করছিল।

        সেই ভিডিও অবশ্য কোনোভাবে আফতাব চৌধুরীর কানে পৌঁছাল। তিনি প্রথমবারের মতো ছেলেকে ডেকে কড়া ধমক দিলেন। বললেন, আমাদের বংশের একটা সম্মান আছে, তুমি সেটা মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছ। রাহাত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, মুখে কিছু বলল না, কিন্তু মনে মনে ভাবল বাবা বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন, এটুকু মজা তো সবাই করে। এই যে নিজের ভুলকে ছোট করে দেখার অভ্যাস, সেটাই ছিল তার আসল বিপদের শুরু।

        এই সময়েই গল্পে প্রবেশ করলেন ফারুক সাহেব, আফতাব চৌধুরীর দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদার এবং তথাকথিত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যখন আফতাব চৌধুরী ছেলের বিষয়ে কড়া হতে চাইছিলেন, তখন ফারুক সাহেব হেসে বলতেন, আরে ভাই, ছেলেমানুষ, বয়সটাই তো এমন, একটু মজা করুক, আমরাও তো এই বয়সে কম করিনি। এই কথাগুলো শুনতে নিরীহ মনে হলেও, পরবর্তীতে বোঝা যাবে এর পেছনে একটা গভীর চক্রান্তের বীজ লুকিয়ে ছিল। ফারুক সাহেব নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে চাইতেন রাহাত বিপথে যাক, যাতে একদিন পুরো ব্যবসাটা তিনি নিজের কব্জায় নিতে পারেন।

        ষোলো বছর বয়সে রাহাত বাবার কাছ থেকে জোর করে একটা স্পোর্টস বাইক আদায় করে নিল। স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন্দর এলাকার খোলা রাস্তায় বন্ধুদের সাথে রেস করত। একদিন প্রায় দুইশো কিলোমিটার গতিতে বাইক চালাতে গিয়ে একটা রিকশাকে সামান্যের জন্য মিস করল, রিকশাওয়ালা পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেললেন। রাহাত ভয় পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল, পরে বাবার লোক পাঠিয়ে টাকা দিয়ে ব্যাপারটা মিটমাট করলেন আফতাব চৌধুরী। এভাবেই প্রতিটা ভুলের পর টাকা দিয়ে সমস্যা মেটানোর অভ্যাস রাহাতকে শিখিয়ে দিল যে জীবনে কোনো কাজেরই আসলে কোনো পরিণতি নেই, টাকা থাকলে সব ঠিক হয়ে যায়।

        এই সময়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ঢাকা আর চট্টগ্রামের অভিজাত পরিবারের সন্তানদের মধ্যে তখন একটা বিশেষ ধরনের সামাজিক বৃত্ত গড়ে উঠেছিল, যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন এলিট সাবকালচার। এই বৃত্তে প্রবেশের জন্য শুধু টাকা থাকলেই হতো না, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পোশাক, নির্দিষ্ট গাড়ি, নির্দিষ্ট ক্লাবের সদস্যপদ থাকা লাগত। এই বৃত্তে টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় পড়ে অনেক তরুণ তরুণী নিজের পরিবারের কষ্টার্জিত অর্থ অপচয় করত, আর ধীরে ধীরে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। রাহাতও এই ফাঁদে সম্পূর্ণভাবে আটকে গিয়েছিল।

        উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে রাহাত ভর্তি হলো ঢাকার একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে পড়াশোনা শেষ করে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরবে। কিন্তু ঢাকায় এসে বাবার সরাসরি নজরদারি থেকে মুক্ত হয়ে রাহাতের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে বইতে লাগল। গুলশান বনানীর অভিজাত এলাকায় সে একটা ফ্ল্যাটে একা থাকত, মাসে মাসে বাবা প্রচুর টাকা পাঠাতেন, সেই টাকার সিংহভাগ চলে যেত রাতের পার্টি, নাইটক্লাব আর জুয়ার আসরে।

        বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই রাহাত একটা গোপন পোকার ক্লাবের সন্ধান পেল, যেখানে শহরের ধনী পরিবারের ছেলেরা রাতভর তাস খেলে লাখ লাখ টাকা হারত জিততো। প্রথম প্রথম রাহাত জিতত, আর জেতার নেশায় সে আরও বেশি করে খেলতে শুরু করল। কিন্তু জুয়ার নিয়মই এই যে শেষ পর্যন্ত ঘরই জেতে। কয়েক মাসের মধ্যে রাহাত প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা ঋণে ডুবে গেল, যেটা সে বাবার নাম করে সুদখোরদের কাছ থেকে ধার নিয়েছিল, এমনকি বাবার সইও জাল করেছিল কয়েকটা চেকে।

        এই সময় তার সাথে পরিচয় হয় সুমাইয়া নামের এক মেয়ের সাথে, যে ছিল আরেকজন ধনী ব্যবসায়ীর মেয়ে। দুজনের সম্পর্ক শুরু হলো, কিন্তু সেটাও গভীর ভালোবাসার চেয়ে বেশি ছিল একসাথে পার্টি করা আর দামি উপহার দেওয়া নেওয়ার সম্পর্ক। একরাতে শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত নাইটক্লাবে রাহাত মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান করে হট্টগোল বাধায়, ক্লাবের নিরাপত্তারক্ষীর সাথে হাতাহাতি করে, আর সেই দৃশ্য কেউ একজন মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়। ভিডিওটা দেখতে দেখতে ভাইরাল হয়ে গেল, আর নিচে লেখা ছিল, শিল্পপতি আফতাব চৌধুরীর ছেলের কাণ্ড।

        পরবর্তীতে জানা যায়, এই ভিডিওটা ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে হাত ছিল ফারুক সাহেবের এক পরিচিত সাংবাদিকের, যাকে তিনি নিজে টাকা দিয়ে কাজে লাগিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল আফতাব চৌধুরীর ব্যবসায়িক সুনাম নষ্ট করা, যাতে সরকারি একটা বড় টেন্ডারে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি সুবিধা পায়, যে কোম্পানিতে ফারুক সাহেবের গোপন শেয়ার ছিল। কিন্তু এই সত্যটা প্রকাশ পেতে অনেক অনেক বছর লেগে যাবে, ততদিনে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।

        সেই ভাইরাল ভিডিওর পরদিন সকালেই চট্টগ্রামের একটা বড় ব্যাংক আফতাব চৌধুরীর কোম্পানির ঋণ পুনর্নবায়নের আবেদন প্রত্যাখ্যান করল, কারণ কোম্পানির সুনামের ঝুঁকি নিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। এভাবে একটা মুহূর্তের বিনোদনের মূল্য যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা রাহাত তখনও বুঝতে পারেনি। এখানে একটা তথ্য উল্লেখযোগ্য, ব্যাংকিং জগতে একে বলা হয় রেপুটেশন রিস্ক, অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুনামের ক্ষতি হলে তার আর্থিক লেনদেনের উপরও সরাসরি প্রভাব পড়ে, ব্যাংকগুলো এই ঝুঁকি এড়াতে চায় সবসময়।

        ভাইরাল ভিডিওর পর থেকে আফতাব চৌধুরীর ব্যবসায় একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসতে লাগল। একটা ইউরোপীয় ক্রেতা কোম্পানি যারা বছরে কয়েক কোটি ডলারের পোশাক অর্ডার দিত, তারা হঠাৎ চুক্তি বাতিল করে দিল, কারণ তাদের নীতিমালায় ছিল যে কোনো বিতর্কিত পরিবারের সাথে ব্যবসা তারা করবে না। এই একটা অর্ডার বাতিলের প্রভাব পড়ল কারখানার তিন হাজার শ্রমিকের জীবনে। কারখানার এক নারী শ্রমিক তার ছোট মেয়েকে নিয়ে ফ্লোরে বসে কাঁদছিলেন, কারণ ওভারটাইম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার মাসিক আয় অর্ধেকে নেমে এসেছিল, আর সেই টাকা দিয়েই তিনি মেয়ের স্কুলের বেতন দিতেন।

        এই দৃশ্যটা যদি রাহাত নিজের চোখে দেখত, হয়তো তার মধ্যে কিছুটা অনুশোচনা জাগত। কিন্তু সে তখনও ঢাকায় নিজের জগতে ব্যস্ত, বাবার ফোন কল এড়িয়ে চলছিল, কারণ সে জানত বাবা তাকে আবার বকবেন। আফতাব চৌধুরীর চুল রাতারাতি সাদা হতে শুরু করল, তিনি রাতের পর রাত ঘুমাতে পারতেন না, ব্যাংকের কিস্তি আর শ্রমিকদের বেতন যোগাড় করতে করতে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে লাগল।

        একদিন অফিসের বোর্ড মিটিংয়ে ফারুক সাহেব খুব চিন্তিত ভাব করে প্রস্তাব দিলেন, ভাই আপনার তো এখন মানসিক চাপ অনেক, আমি বরং আমার শেয়ার আরও বাড়িয়ে নিই, আপনার বোঝা কিছুটা হালকা হবে। আফতাব চৌধুরী বিশ্বাসের সাথে সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন, বুঝতেই পারলেন না যে এটাই ছিল তার সাম্রাজ্য দখলের প্রথম ধাপ। মানুষ যখন সংকটে পড়ে, তখন কার কাছে আসলে সাহায্য চাইছে আর কে আসলে সুযোগ নিচ্ছে, এটা বোঝা খুব কঠিন হয়ে পড়ে, আফতাব চৌধুরীও সেই ভুলই করলেন।

        এই সময় একটা মজার অথচ করুণ ঘটনা ঘটেছিল কারখানায়। শ্রমিকরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন তারা মালিকের কাছে দরখাস্ত দেবেন যাতে বেতন সময়মতো দেওয়া হয়। কিন্তু দরখাস্ত লেখার মতো শিক্ষিত মানুষ কারখানায় কম, তাই একজন কিশোর, যে সবেমাত্র দশম শ্রেণী পাশ করে কারখানায় হিসাবরক্ষকের সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছিল, তাকে দিয়ে দরখাস্ত লেখানো হলো। সেই ছেলেটার নাম ছিল করিম, বয়স মাত্র সতেরো, তার লেখা দরখাস্তে বানান ভুল থাকলেও ভাষায় এমন আকুতি ছিল যে আফতাব চৌধুরী পড়ে চোখের জল আটকাতে পারেননি। এই করিমের সাথে অনেক বছর পর ইতালিতে রাহাতের আবার দেখা হবে, তবে ভিন্ন এক পরিচয়ে।

        তথ্য হিসেবে জেনে রাখা ভালো, পোশাক শিল্পে একটা বড় অর্ডার বাতিল হলে তার প্রভাব শুধু মালিকের উপর পড়ে না, এর সাথে জড়িত থাকে সুতা সরবরাহকারী, বোতাম প্রস্তুতকারক, পরিবহন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শ্রমিকের বাড়িওয়ালা পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ। একটা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পতন আসলে একটা গোটা বাস্তুতন্ত্রের উপর আঘাত হানে, এই সত্যটা রাহাত সেই সময় বুঝতে পারেনি, বুঝেছিল অনেক পরে, ইতালির মাটিতে দাঁড়িয়ে।

        ব্যবসার এই সংকটের মধ্যেই আফতাব চৌধুরী ছেলেকে ঢাকা থেকে ডেকে পাঠালেন। মুখোমুখি বসিয়ে বললেন, বাবা, আমার সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, তুমি এখন বাড়ি ফিরে এসো, ব্যবসা শেখো, আমাকে সাহায্য করো। রাহাত মাথা নেড়ে রাজি হলো ঠিকই, কিন্তু কয়েকদিন পরই আবার পুরনো বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকায় ফিরে গেল একটা পার্টিতে যোগ দিতে। সেই পার্টিতেই ঘটল সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।

        শহরের একটা বড় হোটেলে আয়োজিত এক বিয়ের অনুষ্ঠানে, যেখানে দেশের অনেক প্রভাবশালী মানুষ উপস্থিত ছিলেন, রাহাত মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে হোটেলের গেটে দাঁড়ানো একটা পুলিশের গাড়িতে ধাক্কা মারল। ঘটনাস্থলেই পুলিশ তাকে আটক করল, আর পরদিন সকালেই এই খবর সব পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হলো, শিল্পপতির উচ্ছৃঙ্খল পুত্র মাতাল অবস্থায় পুলিশের গাড়িতে ধাক্কা। এই খবরটা যেন আফতাব চৌধুরীর জীবনের শেষ আঘাত হয়ে এলো।

        থানা থেকে ছেলেকে জামিনে ছাড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে এসে আফতাব চৌধুরী প্রথমবারের মতো ছেলের গায়ে হাত তুললেন, তারপর কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমি সারাজীবন যা গড়েছি তুমি একদিনে সব ধ্বংস করে দিলে। আমার সম্মান, আমার ব্যবসা, আমার পরিচয়, সব শেষ করে দিলে তুমি। মা নাজনিন বেগম দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন, ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু আফতাব চৌধুরী সেদিন প্রথমবারের মতো অটল ছিলেন নিজের সিদ্ধান্তে।

        তিনি বললেন, আজ থেকে তুমি আর এই বাড়ির ছেলে না। তোমার পকেটে যা আছে তাই নিয়ে বেরিয়ে যাও, দেখো জীবন কতটা কঠিন, দেখো টাকা ছাড়া দুনিয়া কেমন। রাহাত প্রথমে ভেবেছিল এটা বাবার সাময়িক রাগ, কয়েকদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যখন সে দেখল সত্যি সত্যি বাড়ির দারোয়ান তাকে গেট থেকে বের করে দিচ্ছে, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন বুকের ভেতরটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল। জীবনে প্রথমবারের মতো সে অনুভব করল ভয় কাকে বলে।

        সেদিন সন্ধ্যায় গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রাহাত পেছনে ফিরে তাকিয়েছিল সেই বাড়ির দিকে, যেখানে সে জন্মেছিল, বড় হয়েছিল, যে বাড়ির প্রতিটা ইট চিনত তাকে। পকেটে তার ছিল মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা আর একটা মোবাইল ফোন। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটা প্লেনের দিকে তাকিয়ে সে ভাবছিল না যে একদিন এই আকাশ দিয়েই সে অনেক দূরের এক দেশে পাড়ি জমাবে, আর সেই যাত্রা হবে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।

        প্রথম কয়েকদিন রাহাত ভেবেছিল বন্ধুদের বাসায় থেকে সময় পার করবে, বাবা ঠান্ডা হলে বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু যে বন্ধুরা তার টাকায় বছরের পর বছর পার্টি করেছে, তারা একে একে ফোন ধরা বন্ধ করে দিল। সুমাইয়াও তার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল, মাস দুয়েক পরে জানা গেল সে অন্য এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। এই একটা সত্য রাহাত শিখল খুব দ্রুত, টাকা থাকলে যে বন্ধু তোমার চারপাশে ভিড় করে, টাকা ফুরিয়ে গেলে সেই একই বন্ধু তোমাকে চিনতেই অস্বীকার করে।

        এক সপ্তাহের মধ্যে হাতের টাকা ফুরিয়ে গেল। রাহাত প্রথমে তার দামি হাতঘড়ি বিক্রি করল, তারপর মোবাইল ফোন। ঢাকার ফুটপাতে রাত কাটাতে শুরু করল, কমলাপুর রেলস্টেশনের আশেপাশে। প্রথম রাতে ক্ষুধায় পেট মোচড় দিচ্ছিল, কিন্তু লজ্জায় সে কারো কাছে ভিক্ষা চাইতে পারেনি। এক বৃদ্ধ রিকশাচালক তাকে অনেকক্ষণ লক্ষ্য করে বুঝলেন ছেলেটা না খেয়ে আছে, নিজের পোটলা থেকে অর্ধেক রুটি বের করে দিয়ে বললেন, বাবা খাও, না খেয়ে থাকলে শরীর চলবে না। রাহাত সেই রুটি হাতে নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল, জীবনে এই প্রথম সে বুঝল একজন সম্পূর্ণ অচেনা গরিব মানুষের মমতা কতটা গভীর হতে পারে।

        সেই বৃদ্ধ রিকশাচালকের নাম ছিল হাসেম মিয়া। তিনিই রাহাতকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে স্টেশনে মালামাল ওঠানামা করে দিনে একশো দেড়শো টাকা রোজগার করা যায়। প্রথম দিন ভারী বস্তা তুলতে গিয়ে রাহাতের পিঠে এমন ব্যথা হলো যে সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না, অথচ এই একই ধরনের কাজ কারখানার শ্রমিকরা প্রতিদিন করে যেত, যাদের ঘামে তার বাবার ব্যবসা দাঁড়িয়েছিল। এই বিদ্রুপাত্মক সত্যটা তার মাথায় ধীরে ধীরে ঢুকতে শুরু করল।

        কয়েক মাস এভাবে কাটার পর একদিন হাসেম মিয়া হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন, হাসপাতালে নেওয়ার মতো টাকাও ছিল না তার কাছে। রাহাত সেদিন প্রথমবারের মতো নিজের জন্য নয়, অন্য একজনের জন্য কাঁদল, দিনভর স্টেশনে স্টেশনে ঘুরে চাঁদা তুলে বৃদ্ধকে হাসপাতালে ভর্তি করাল। এই ঘটনাটা তার মধ্যে একটা পরিবর্তনের বীজ বপন করল, যদিও সেই বীজ অঙ্কুরিত হতে আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে।

        এই সময়ের একটা তথ্য জানা দরকার, বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে ভাসমান জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ আসলে গ্রাম থেকে আসা মানুষ যারা কাজের সন্ধানে শহরে আসেন কিন্তু আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারেন না। রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত এই মানুষদের সাময়িক আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অসংখ্য প্রতিভা আর গল্প, যা কখনো কারো নজরে আসে না, ঠিক যেমন হাসেম মিয়ার মতো মানুষদের গল্প কখনো সংবাদপত্রের পাতায় জায়গা পায় না।

        স্টেশনে কাজ করা অন্য শ্রমিকদের মুখে মুখে একটা কথা প্রায়ই শোনা যেত, ইতালি। তারা বলাবলি করত, ইতালি গেলে নাকি রাতারাতি ভাগ্য বদলে যায়, ওখানে ইউরো কামিয়ে দেশে ফিরে দালান বানানো যায়, ছেলেমেয়ের বিয়ে দেওয়া যায় জমকালো করে। রাহাতের মনে এই কথাগুলো গেঁথে গেল, তার মনে হলো এটাই হয়তো তার নতুন জীবন শুরু করার পথ, যেখানে তার পুরনো পরিচয়ের কোনো বোঝা থাকবে না, নতুন করে শুরু করা যাবে।

        এমনই একদিন স্টেশন এলাকায় তার পরিচয় হলো আজম মাতব্বর নামের এক লোকের সাথে, যে নিজেকে পরিচয় দিল ম্যানপাওয়ার এজেন্সির প্রতিনিধি হিসেবে। আজম মাতব্বরের কথাবার্তা ছিল খুব মিষ্টি, সে বলল, ইতালিতে তার নাকি বড় বড় লোকের সাথে যোগাযোগ আছে, ভিসার ব্যবস্থা সে করে দিতে পারবে, শুধু একটা নির্দিষ্ট অংক টাকা লাগবে। রাহাতের কাছে তখন এক টাকাও ছিল না, সে কথাটা বলতেই আজম মাতব্বর একটু ভেবে বলল, তুমি না হয় ওখানে গিয়ে কাজ করে আমার টাকা শোধ করে দিও, তবে তার আগে তোমাকে আমার সাথে কিছু কাজ করতে হবে, তাতে আমি তোমার যাত্রার খরচ কিছুটা কমিয়ে দেব।

        পরের কয়েক মাস রাহাত আজম মাতব্বরের ছোটখাটো কাজ করে দিত, কখনো কাগজপত্র পৌঁছে দেওয়া, কখনো নতুন খদ্দের জোগাড় করে দেওয়া। এই সময় সে দেখেছিল আজম মাতব্বরের অফিসে প্রতিদিন কত মানুষ আসত, সবার চোখে একই স্বপ্ন, ইউরোপে গিয়ে ভাগ্য ফেরানোর স্বপ্ন। কেউ জমি বিক্রি করে টাকা এনেছে, কেউ স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখেছে, কেউ ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছে। আজম মাতব্বর প্রত্যেকের কাছেই একই গল্প বলত, ইতালিতে পৌঁছালেই মাসে লাখ টাকা আয়, এটা বলতে তার একটুও দ্বিধা হতো না।

        এখানে জানা দরকার একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বাংলাদেশের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো নামের একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের কাজ হলো বৈধ পথে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির তদারকি করা। কিন্তু এই বৈধ পথের বাইরেও একটা বিশাল অবৈধ চক্র সক্রিয়, যাকে সাধারণ মানুষ বলে গেম দেওয়া বা ডাংকি রুট। এই পথে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়, যেখানে প্রতি বছর শত শত মানুষ মারা যান, ডুবে যান সাগরে, মরুভূমিতে পানির অভাবে মারা যান, অথবা দালালদের নির্যাতনে প্রাণ হারান। এই সত্যটা আজম মাতব্বর কখনোই তার খদ্দেরদের বলত না।

        রাহাত যখন জানতে পারল যে তাকে বৈধ ভিসায় নয়, বরং এই অবৈধ পথেই যেতে হবে, তখন প্রথমে সে ভয় পেয়েছিল, পিছিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু আজম মাতব্বর তাকে বোঝাল, এই পথেই হাজার হাজার মানুষ গেছে সফলভাবে, একবার ইতালির মাটিতে পা রাখতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, ওখানে আশ্রয়ের আবেদন করলেই থাকার অনুমতি পাওয়া যায়। রাহাতের তখন হারানোর মতো আর কিছুই ছিল না, বাবার বাড়ি, বন্ধু, প্রেমিকা, সবকিছু সে হারিয়েছে ইতিমধ্যে। তাই সে রাজি হয়ে গেল, স্বাক্ষর করল একটা কাগজে, যেখানে লেখা ছিল ইতালি পৌঁছানোর পর তাকে তেরো লাখ টাকা শোধ করতে হবে সুদসহ।

        যাত্রা শুরু হলো এক ভোররাতে। রাহাতসহ মোট সতেরো জনের একটা দল প্রথমে বিমানে করে পৌঁছাল দুবাই, সেখান থেকে আরেকটা ফ্লাইটে মিশরের কায়রো, তারপর স্থলপথে দীর্ঘ যাত্রা শুরু হলো লিবিয়ার দিকে। সীমান্ত পেরোনোর সময় তাদের গাদাগাদি করে বসানো হলো একটা ছোট ট্রাকে, উপরে ঢাকা দেওয়া হলো প্লাস্টিকের চাদর দিয়ে, যাতে বাইরে থেকে কেউ দেখতে না পারে। ভেতরে প্রচণ্ড গরম, দমবন্ধ পরিবেশ, তার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছিল কোনো নড়াচড়া ছাড়াই।

        মরুভূমির মধ্য দিয়ে যাত্রার তৃতীয় দিনে দলের একজন তরুণ, যার নাম ছিল সোহেল, পানির অভাবে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। দালালরা তাকে সাহায্য করার বদলে গালাগাল করতে লাগল, বলল সময় নষ্ট করা যাবে না। সোহেলের অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল, তার ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরোতে শুরু করল, চোখ উল্টে গেল। রাহাত নিজের ভাগের সামান্য পানি সোহেলের মুখে ঢেলে দিল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। পরদিন সকালে সোহেল আর শ্বাস নিচ্ছিল না। দালালরা মরুভূমির বালির মধ্যেই তাকে ফেলে রেখে বাকিদের নিয়ে এগিয়ে গেল, কারো মৃত্যুর জন্য থেমে থাকার সময় তাদের ছিল না।

        সেই রাতে রাহাত ঘুমাতে পারেনি, আকাশের অসংখ্য তারার দিকে তাকিয়ে সে ভাবছিল, তার বাবার প্রাসাদে কত আলো জ্বলত রাতভর, অথচ এই মরুভূমিতে একটা মানুষের প্রাণের কোনো মূল্যই নেই। এই তুলনাটা তার মনে এমন একটা দাগ কেটে দিল যা সারাজীবন সে ভুলতে পারেনি। এই মুহূর্ত থেকেই তার মনে একটা প্রতিজ্ঞা জন্ম নিতে শুরু করল, যদি কোনোদিন সে বেঁচে ফিরতে পারে, তাহলে সে এমন মানুষদের জন্য কিছু একটা করবে।

        লিবিয়া পৌঁছানোর পর তাদের একটা গোপন ঘাঁটিতে বন্দি করে রাখা হলো, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় কানেকশন হাউজ। সেখানে আরও বাড়তি টাকার দাবি করা হলো, যাদের পরিবার টাকা পাঠাতে পারল না তাদের বেধড়ক মারধর করা হতো, কারো কারো ফোনে মারধরের শব্দ শুনিয়ে পরিবারের কাছে টাকা আদায় করা হতো। রাহাতের কোনো পরিবার ছিল না যাকে ফোন করে টাকা চাওয়া যায়, এটা জানার পর দালালরা তাকে সবচেয়ে খারাপ ব্যবহার করত, ভাবত তার কাছ থেকে বাড়তি কিছু আদায় করা যাবে না। বিদ্রুপাত্মকভাবে এই কারণেই হয়তো তারা তাকে দ্রুত পরের দলের সাথে সাগর পাড়ির জন্য পাঠিয়ে দিল, একটা বোঝা কমানোর মতো করে।

        এক অন্ধকার রাতে ভূমধ্যসাগরের তীরে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে অপেক্ষা করছিল একটা রাবারের নৌকা, যেটাতে ধারণক্ষমতার তিনগুণ মানুষ, প্রায় একশো দশ জনকে গাদাগাদি করে তোলা হলো। নৌকা যখন গভীর সমুদ্রে পৌঁছাল, হঠাৎ ঝড় উঠল, বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল নৌকার গায়ে। বাচ্চাদের কান্না, মহিলাদের চিৎকার, আর ইঞ্জিনের বিকট শব্দের মধ্যে রাহাত শক্ত করে ধরে ছিল নৌকার কিনারা, মনে মনে বলছিল, বাবা আমাকে ক্ষমা করে দাও। প্রায় আঠারো ঘণ্টা সমুদ্রে ভাসার পর, যখন সবাই প্রায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছিল, একটা ইতালিয়ান উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ তাদের দেখতে পেল এবং উদ্ধার করল। রাহাত যখন জাহাজের ডেকে পা রাখল, হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল, কেঁদে ফেলল, তার মনে হচ্ছিল সে নতুন করে জন্ম নিল।

        সিসিলি দ্বীপের একটা অভিবাসন গ্রহণ কেন্দ্রে রাহাতসহ উদ্ধার হওয়া সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা, খাবার আর থাকার ব্যবস্থা করা হলো, কিন্তু সাথে সাথেই শুরু হলো এক দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। আশ্রয়ের আবেদন করতে হলো, বারবার সাক্ষাৎকার দিতে হলো ইতালিয়ান কর্মকর্তাদের কাছে, দোভাষীর মাধ্যমে নিজের গল্প বলতে হলো বারবার। এই প্রক্রিয়া কতদিনে শেষ হবে কেউ জানত না, ছয় মাস, এক বছর, এমনকি দুই বছরও লাগতে পারত।

        এই কেন্দ্রেই রাহাতের পরিচয় হলো করিম নামের এক বয়স্ক বাংলাদেশি লোকের সাথে, যিনি প্রায় বিশ বছর ধরে ইতালিতে আছেন। প্রথম পরিচয়ের সময় করিম চাচা যখন বললেন তার আসল নাম ও তিনি একসময় চট্টগ্রামে চৌধুরী গ্রুপের কারখানায় কাজ করতেন, রাহাতের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। এই সেই করিম, যে কিশোর বয়সে দরখাস্ত লিখে শ্রমিকদের বেতনের জন্য আকুতি জানিয়েছিল। কিন্তু রাহাত নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখল, বলল সে সাধারণ এক পরিবারের ছেলে, তার বাবা ছোট ব্যবসায়ী ছিলেন। মিথ্যা বলার এই মুহূর্তটাই আসলে তার নতুন জীবনের প্রথম সচেতন সিদ্ধান্ত, সে বুঝেছিল অতীতের পরিচয় দিয়ে নয়, নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করেই সে বাঁচবে।

        কাগজপত্রের প্রক্রিয়া চলাকালীন আইনত কাজ করার অনুমতি ছিল না, কিন্তু পেট চালানোর তাগিদে রাহাত অবৈধভাবে ছোটখাটো কাজ খুঁজতে লাগল। কখনো রাস্তার পাশে গাড়ি ধোয়ার কাজ, কখনো নির্মাণ শ্রমিকের সহকারী, কিন্তু এসব কাজে নিয়মিততা ছিল না, একদিন কাজ থাকত তো তিনদিন থাকত না। করিম চাচা তাকে বললেন, ভাই এভাবে চলবে না, তুমি বরং দক্ষিণে চলো, কৃষিক্ষেতে কাজ পাওয়া যায়, তবে সেখানকার পরিস্থিতিও সহজ না।

        এই সময়ের একটা তথ্য জানা দরকার। ইতালিতে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডাবলিন রেগুলেশন অনুযায়ী কোন দেশে প্রথম পা রাখা হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে আশ্রয় আবেদনের দায়িত্ব নির্ধারিত হয়, যেহেতু ইতালি ভূমধ্যসাগরের প্রবেশদ্বার, তাই ইতালিতেই সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে এই আবেদনের। এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়টাতেই অনেক অভিবাসী বাধ্য হয়ে অবৈধ শ্রমবাজারে ঢুকে পড়েন, যেখানে তাদের শোষণ করার সুযোগ পায় অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীরা।

        তিন মাস পর রাহাত করিম চাচার পরামর্শে দক্ষিণ ইতালির পুইলিয়া অঞ্চলে রওনা দিল, যেখানে টমেটো ক্ষেতে মৌসুমি শ্রমিকের চাহিদা থাকে। ট্রেনে করে যাওয়ার সময় জানালা দিয়ে সবুজ ক্ষেত দেখতে দেখতে তার মনে পড়ল ছোটবেলায় পাহাড়ি ফয়েজলেকের কথা, যেখানে সে গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াত। জীবনের এই বৈপরীত্য তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিত যে সে কতটা নিচে নেমে এসেছে, অথচ এই নিচে নামাটাই তাকে জীবনের আসল রূপ চিনতে সাহায্য করছিল।

        পুইলিয়া পৌঁছে রাহাত দেখল সেখানে শত শত অভিবাসী শ্রমিক একসাথে থাকেন এক অস্থায়ী বস্তিতে, যাকে স্থানীয়রা বলে ঘেট্টো। টিনের চাল আর পলিথিনের বেড়া দিয়ে তৈরি সেই ঘরগুলোতে বিদ্যুৎ নেই, পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা নেই, টয়লেট বলতে খোলা মাঠ। এখানকার শ্রমিকরা আসতেন আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে, সবার একটাই কাজ, ভোর হওয়ার আগে ক্ষেতে গিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত টমেটো তোলা।

        এই ব্যবস্থাটার নাম কাপোরালাতো, যেখানে একজন গ্যাংমাস্টার বা কাপোরাল শ্রমিকদের ভাড়া করে খামারের মালিকের কাছে সরবরাহ করে, আর মাঝখান থেকে বিশাল অংশ কমিশন কেটে রাখে। রাহাত দিনে বারো ঘণ্টা প্রচণ্ড রোদে কাজ করে পেত মাত্র পঁচিশ ইউরো, তার থেকেও কেটে নেওয়া হতো পরিবহন খরচ আর পানির বোতলের দাম। প্রথম সপ্তাহেই তার হাতের তালুতে এত ফোসকা পড়ল যে রাতে ব্যথায় ঘুমাতে পারত না, অথচ পরদিন ভোরেই আবার উঠে যেতে হতো কাজে, নাহলে সেদিনের মজুরি জুটবে না।

        এই কষ্টের মধ্যেও একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। একদিন কাপোরাল, যার নাম ছিল ভিতো, রাহাতকে দেখে বলল, তুমি তো বাংলাদেশি, তোমাদের দেশের একটা কথা আমি শুনেছি, ধীরে চলো তাড়াতাড়ি পৌঁছাবে। রাহাত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল কোথায় শুনেছেন এই কথা, ভিতো হাসতে হাসতে বলল, আমার আগের এক শ্রমিক বলেছিল, তার নাম ছিল রফিক। এই ছোট্ট মানবিক মুহূর্তগুলোই কঠিন সময়ে বেঁচে থাকার রসদ জোগাত, প্রমাণ করত যে নিষ্ঠুরতার মধ্যেও মানুষে মানুষে সংযোগের একটা সুতো থেকেই যায়।

        কয়েক সপ্তাহ পর একজন সহকর্মী শ্রমিক, ঘানার এক তরুণ যার নাম ছিল কোফি, প্রচণ্ড গরমে কাজ করতে করতে হিট স্ট্রোকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কাছাকাছি কোনো হাসপাতাল ছিল না, ক্ষেতের মালিক অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে দেরি করলেন, কারণ তিনি চাইতেন না পুলিশ এসে তার অবৈধ শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টা জেনে ফেলুক। প্রায় এক ঘণ্টা পর অ্যাম্বুলেন্স এলো, কিন্তু ততক্ষণে কোফির অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনা রাহাতের মধ্যে গভীর ক্ষোভ জন্ম দিল, সে বুঝতে পারল এই ব্যবস্থাটা বদলাতেই হবে, কিন্তু কীভাবে বদলাবে তখনও জানত না।

        এই সময়ের একটা পরিসংখ্যানগত তথ্য জানা প্রয়োজন। ইতালির কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ ইতালির কৃষিক্ষেত্রে কয়েক লক্ষ অভিবাসী শ্রমিক মৌসুমি কাজে নিয়োজিত থাকেন, যাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কাপোরালাতো ব্যবস্থার শিকার হন। এই সমস্যা সমাধানে ইতালি সরকার একাধিকবার আইন প্রণয়ন করেছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে সমস্যাটা এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। রাহাতের অভিজ্ঞতা ছিল এই বৃহত্তর সমস্যারই একটা ছোট প্রতিচ্ছবি মাত্র।

        প্রায় আট মাস কাপোরালাতো ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করার পর একদিন করিম চাচা রাহাতকে খুঁজে বের করলেন। তিনি নিজে ততদিনে বৈধ কাগজপত্র পেয়ে গিয়েছিলেন এবং একটা ছোট বাংলাদেশি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন যারা নতুন অভিবাসীদের সাহায্য করত। করিম চাচা রাহাতকে বললেন, তুমি এভাবে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছ, চলো আমার সাথে, আমি তোমাকে একজন সৎ খামার মালিকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব, যিনি ন্যায্য মজুরি দেন।

        সেই খামার মালিক, জিউসেপ্পে নামের এক বয়স্ক ইতালিয়ান ভদ্রলোক, রাহাতকে কাজে নিলেন এবং প্রথমবারের মতো তাকে একজন মানুষ হিসেবে সম্মান দেখালেন। তিনি বলতেন, আমি জানি তোমরা কত কষ্ট করে এখানে এসেছ, আমি চাই তোমরা এখানে অন্তত মানুষের মতো বাঁচো। জিউসেপ্পের খামারে কাজ করতে করতে রাহাত ইতালিয়ান ভাষা শিখতে শুরু করল, প্রতি সন্ধ্যায় করিম চাচা তাকে সাহায্য করতেন নতুন নতুন শব্দ শেখাতে।

        এই সময় রাহাত প্রথমবারের মতো নিজের ইচ্ছায়, কোনো চাপ ছাড়াই, একটা স্থানীয় সন্ধ্যাকালীন স্কুলে ভর্তি হলো, যেখানে অভিবাসীদের বিনামূল্যে ইতালিয়ান ভাষা ও সাধারণ শিক্ষা দেওয়া হতো। ক্লাসে বসে বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে তার মনে পড়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোর কথা, যখন সে টাকা দিয়ে পরীক্ষায় পাস করত, পড়াশোনাকে গুরুত্বই দিত না। এখন সেই একই মানুষ রাতের পর রাত জেগে ব্যাকরণ মুখস্থ করছে, শুধু একটা ভালো ভবিষ্যতের আশায়।

        করিম চাচা একদিন রাহাতকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পরিবারের কথা কখনো বলো না কেন। রাহাত অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে অবশেষে নিজের আসল পরিচয় জানাল, বলল কীভাবে সে চৌধুরী বাড়ির ছেলে থেকে রাস্তার মানুষ হয়ে গিয়েছিল। করিম চাচা প্রথমে অবাক হলেন, তারপর তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, অতীত যাই হোক, এখন তুমি যা করছ সেটাই তোমার আসল পরিচয়। এই কথাটা রাহাতের বুকের ভেতর গেঁথে গেল, যেন কেউ তাকে নতুন করে বাঁচার অনুমতি দিল।

        এই সময় রাহাত মাঝে মাঝে ভাবত তার বাবা মা কেমন আছেন, ব্যবসার কী অবস্থা, কিন্তু গর্ব আর লজ্জা দুটোই তাকে আটকে রাখত যোগাযোগ করা থেকে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল, যতদিন না সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে, ততদিন সে বাড়িতে যোগাযোগ করবে না। এই জেদটাই তাকে পরিশ্রম করার আরও শক্তি জোগাত, প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে সে নিজেকে বলত, আজকের দিনটা গতকালের চেয়ে ভালো করতে হবে।

        সন্ধ্যাকালীন স্কুলেই রাহাতের পরিচয় হলো তানিয়ার সাথে, যিনিও বাংলাদেশ থেকে আসা এক অভিবাসী, তবে তিনি এসেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে, একটা বৈধ শিক্ষার্থী ভিসায়, পরিবারের সহায়তায়। তানিয়া পড়াশোনা করছিলেন কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে, পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করতেন একটা রেস্তোরাঁয়। ক্লাসে দুজনের পাশাপাশি বসা থেকে শুরু হওয়া পরিচয় ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে রূপ নিল।

        তানিয়ার মধ্যে রাহাত এমন একটা জিনিস খুঁজে পেল যা তার অতীতের কোনো সম্পর্কে ছিল না, নিঃস্বার্থ আগ্রহ। তানিয়া তার কাছে টাকা চাইতেন না, দামি উপহার চাইতেন না, শুধু চাইতেন রাহাত যেন নিজের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করে। একদিন ক্লাস শেষে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রতীরে চলে গেলেন, সেখানে বসে রাহাত প্রথমবারের মতো কাউকে নিজের পুরো গল্প খুলে বললেন, শৈশবের বিলাসিতা থেকে শুরু করে মরুভূমি আর সাগরের সেই ভয়ংকর রাত পর্যন্ত।

        তানিয়া চুপচাপ পুরো গল্প শুনলেন, তারপর বললেন, তুমি যা করেছ তার জন্য তোমাকে মূল্য দিতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখন তুমি যা হয়ে উঠছ, সেটার জন্য আমি তোমাকে সম্মান করি। এই কথাটা শুনে রাহাতের চোখে জল এসে গেল, বহুদিন পর কেউ তাকে সম্মানের চোখে দেখল, তার অতীতের বিচার না করে বর্তমানের পরিশ্রমকে মূল্য দিল।

        তানিয়া তাকে উৎসাহ দিলেন কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে আরও জানার জন্য, বললেন তুমি তো প্রতিদিন মাটির সাথে কাজ করছ, একটু বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝলে হয়তো ভালো কিছু করতে পারবে। তানিয়ার পরামর্শেই রাহাত স্থানীয় গ্রন্থাগার থেকে কৃষি সংক্রান্ত বই ধার করে পড়তে শুরু করল, মাটির গঠন, জৈব সার তৈরির পদ্ধতি, ফসলের রোগ প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে লাগল।

        এই সম্পর্কের মধ্যে দিয়েই রাহাত বুঝতে শিখল প্রকৃত ভালোবাসা কাকে বলে, যেখানে একজন মানুষ আরেকজনকে তার সেরা সংস্করণ হয়ে উঠতে সাহায্য করে, বিনিময়ে কিছু দাবি করে না। এই উপলব্ধি তার পুরনো জীবনের সব সম্পর্কের সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল, যেখানে ভালোবাসা মানেই ছিল দামি উপহার আর জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনী।

        খামারে কাজ করতে করতে রাহাত লক্ষ্য করত প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ টমেটো নষ্ট হয়ে ফেলে দেওয়া হয়, যেগুলো আকারে ছোট বা সামান্য দাগযুক্ত বলে বাজারে বিক্রি করা যায় না। এই নষ্ট টমেটোর স্তূপ দেখতে দেখতে তার মাথায় একটা চিন্তা এলো, এগুলো ফেলে না দিয়ে যদি জৈব সারে রূপান্তরিত করা যায়, তাহলে খামারের খরচ কমবে আর মাটির উর্বরতাও বাড়বে। তানিয়ার কাছ থেকে ধার নেওয়া বইয়ে পড়া কম্পোস্টিং পদ্ধতির জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সে একটা ছোট পরীক্ষা শুরু করল খামারের এক কোণে।

        প্রথমবার তার পদ্ধতি পুরোপুরি ব্যর্থ হলো, কম্পোস্টের স্তূপে দুর্গন্ধ ছড়াল, পোকামাকড়ের উপদ্রব হলো, খামারের অন্য শ্রমিকরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করল, বলল বাংলাদেশি ছেলেটা বিজ্ঞানী হতে চাইছে। জিউসেপ্পে অবশ্য তাকে থামালেন না, বললেন, চেষ্টা করতে থাকো, ভুল থেকেই শেখা যায়। রাহাত হাল না ছেড়ে তানিয়ার সাহায্যে সঠিক অনুপাতে কার্বন আর নাইট্রোজেনযুক্ত উপাদান মিশিয়ে, নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রেখে নতুন করে পদ্ধতিটা ঠিক করল।

        তৃতীয়বারের চেষ্টায় সাফল্য এলো। তার তৈরি জৈব সার প্রয়োগ করা জমিতে টমেটোর ফলন আগের চেয়ে প্রায় বিশ শতাংশ বেড়ে গেল, আর সাথে সাথে রাসায়নিক সারের খরচও অনেকটা কমে গেল। জিউসেপ্পে এই ফলাফল দেখে অবাক হয়ে গেলেন, তিনি স্থানীয় কৃষি সমবায় সমিতির একটা বৈঠকে রাহাতকে ডেকে নিয়ে গেলেন তার পদ্ধতি ব্যাখ্যা করার জন্য।

        এই সময় রাহাতের মাথায় আরেকটা চিন্তা এলো, যেটা তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল।     সে ভাবল, তার মতো হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিক দালাল আর কাপোরালদের হাতে শোষিত হচ্ছে কারণ তাদের কাছে সরাসরি খামার মালিকদের সাথে যোগাযোগ করার কোনো উপায় নেই। সে একটা সহজ মোবাইল ফোন ভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবল, যেখানে খামার মালিকরা সরাসরি তাদের প্রয়োজনীয় শ্রমিকের সংখ্যা আর মজুরি জানাতে পারবেন, আর শ্রমিকরা মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন।

        তানিয়ার এক বন্ধু, যে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করছিল, রাহাতের এই ধারণা শুনে আগ্রহী হয়ে উঠল। তিনজন মিলে রাতের পর রাত জেগে একটা সাধারণ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের নকশা তৈরি করলেন, যেটার নাম দেওয়া হলো ক্যাম্পো দিরেত্তো, অর্থাৎ সরাসরি ক্ষেত। এই অ্যাপের মূল লক্ষ্য ছিল কাপোরালাতো ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সরাসরি, স্বচ্ছ যোগাযোগ তৈরি করা।

        জিউসেপ্পের খামারে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে এই অ্যাপ ব্যবহার শুরু হলো। প্রথম মাসেই দেখা গেল, শ্রমিকরা আগের চেয়ে প্রায় চল্লিশ শতাংশ বেশি মজুরি পাচ্ছেন, কারণ মাঝখানের কমিশন খাওয়া কাপোরালরা বাদ পড়ে গেছে। এই খবর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল আশেপাশের খামারগুলোতে, একে একে আরও কয়েকজন খামার মালিক এই ব্যবস্থায় যুক্ত হতে আগ্রহ দেখালেন।

        স্থানীয় একটা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক রাহাতের কম্পোস্ট পদ্ধতি আর অ্যাপের কথা শুনে তার সাথে দেখা করতে এলেন। তিনি বললেন, তুমি যা করেছ তা একাডেমিক গবেষণার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, আমি চাই তুমি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে একটা প্রেজেন্টেশন দাও। রাহাত প্রথমে ভয় পেয়েছিল, ভেবেছিল তার ভাঙা ভাঙা ইতালিয়ান ভাষায় সে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত মানুষদের সামনে কথা বলবে। কিন্তু তানিয়া তাকে সাহস জোগালেন, বললেন, তুমি ভাষা দিয়ে নয়, তোমার কাজ দিয়ে কথা বলবে।

        সেই প্রেজেন্টেশন এমনভাবে সফল হলো যে স্থানীয় একটা সংবাদপত্র তার উপর একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করল, শিরোনাম ছিল, নষ্ট টমেটো থেকে সোনা বানানো বাংলাদেশি যুবক। এই খবর আরও কয়েকটা বড় সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল, একটা স্থানীয় ব্যাংক তার কম্পোস্ট প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের জন্য ছোট আকারের ঋণ দিতে রাজি হলো।

        এই টাকা দিয়ে রাহাত ও তার দুই সহযোগী মিলে একটা ছোট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করলেন, নাম দিলেন বিও তেরা, যার অর্থ জৈব মাটি। এই কোম্পানির প্রথম নীতিই ছিল, যারা এখানে কাজ করবে তাদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া হবে, কোনো কাপোরাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে নয়। রাহাত ইচ্ছা করেই এই কোম্পানিতে অগ্রাধিকার দিলেন তার মতো সংগ্রামী অভিবাসীদের নিয়োগ দিতে, যারা একসময় কাপোরালাতো ব্যবস্থার শিকার হয়েছিলেন।

        মাত্র দুই বছরের মধ্যে বিও তেরা দক্ষিণ ইতালির একাধিক প্রদেশে তাদের কম্পোস্ট প্রযুক্তি সরবরাহ করতে লাগল, আর তাদের অ্যাপ ব্যবহার করে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক সরাসরি খামার মালিকদের সাথে যুক্ত হয়ে গেলেন, শোষণমুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পেলেন। রাহাত যখন প্রথম মাসের বেতনের চেক নিজের হাতে সই করে কর্মীদের দিলেন, তার মনে পড়ল হাসেম মিয়ার কথা, যিনি তাকে অর্ধেক রুটি ভাগ করে দিয়েছিলেন। সে মনে মনে ভাবল, এই সাহায্যের ঋণ কোনোদিনও শোধ হওয়ার নয়, তবে অন্তত অন্য কাউকে সাহায্য করে সেই ঋণের কিছুটা ফেরত দেওয়া যায়।

        ব্যবসা বড় হওয়ার সাথে সাথে রাহাত ভুলে যায়নি তার নিজের সেই ভয়ংকর অতীত, যখন সে মরুভূমি আর সাগর পাড়ি দিয়ে এসেছিল। কোম্পানির লাভের একটা অংশ দিয়ে সে একটা ছোট আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করল, যেখানে নতুন আসা অভিবাসীরা প্রাথমিকভাবে থাকতে পারতেন, বিনামূল্যে ইতালিয়ান ভাষা শিখতে পারতেন, আর নিরাপদ কর্মসংস্থানের সন্ধান পেতেন। এই কেন্দ্রের নাম দেওয়া হলো ঘর, বাংলা শব্দটাই বেছে নিয়েছিল রাহাত, কারণ সে জানত পরদেশে একটা নিরাপদ ঘরের অভাব কতটা কষ্টের।

        করিম চাচাকে রাহাত এই কেন্দ্রের প্রধান দায়িত্বে বসাল, বলল, চাচা আপনিই তো আমাকে প্রথম হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, এখন আপনি আরও অনেকের জন্য সেই একই কাজ করবেন। করিম চাচা প্রথমে বিস্মিত হলেও পরে গর্বের সাথে এই দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন মানুষ এই কেন্দ্রে আসতেন, তাদের প্রত্যেকের গল্পই ছিল রাহাতের নিজের গল্পের প্রতিচ্ছবি, শুধু চরিত্রের নাম আলাদা।

        রাহাত এই সময় বাংলাদেশে একটা সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করল যারা নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ করত। তাদের মাধ্যমে সে ভিডিও বার্তা পাঠাল গ্রামের তরুণদের উদ্দেশ্যে, যেখানে সে নিজের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা খুলে বলল, দালালদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানাল। এই ভিডিওটা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল, অনেক পরিবার এই ভিডিও দেখে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এলো।

        একদিন এমনই একটা ঘটনা ঘটল যা রাহাতের মনে গভীর দাগ কাটল। তার আশ্রয়কেন্দ্রে এক তরুণ এলো, যার নাম ছিল জসিম, সেও একই দালাল আজম মাতব্বরের খপ্পরে পড়ে একই ভয়ংকর পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিল, তবে কয়েক বছর পর। জসিমের মুখে আজম মাতব্বরের নাম শুনে রাহাতের পুরনো ক্ষত আবার জেগে উঠল, সে বুঝল সেই দালাল এখনও একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, আরও কত মানুষের জীবন নষ্ট করছে।

        রাহাত সিদ্ধান্ত নিল, শুধু ভুক্তভোগীদের সাহায্য করলেই হবে না, এই দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াও দরকার। সে বাংলাদেশের একজন আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করল, জসিম আর অন্যান্য ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করে আজম মাতব্বরের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করল। এই লড়াই সহজ ছিল না, দালাল চক্রের স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব ছিল, কিন্তু রাহাত পিছু হটল না।

        এই সময়ই ঘটল গল্পের সবচেয়ে বড় মোড়। একজন ইতালিয়ান সাংবাদিক, যিনি অভিবাসী উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র বানাচ্ছিলেন, রাহাতের সফলতার গল্প শুনে তার সাথে সাক্ষাৎকার নিতে এলেন। সাক্ষাৎকারের সময় রাহাত প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে নিজের আসল পরিচয় জানাল, বলল সে আসলে চট্টগ্রামের শিল্পপতি আফতাব চৌধুরীর ছেলে। এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের কয়েকটা সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হলো।

        এই খবর পড়ে বাংলাদেশে থাকা এক ব্যক্তি, যিনি একসময় ফারুক সাহেবের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করতেন, রাহাতের সাথে যোগাযোগ করলেন। তার নাম ছিল মিলন, তিনি অনুশোচনায় ভুগছিলেন বহুদিন ধরে, কারণ তিনি জানতেন এমন কিছু সত্য যা প্রকাশ করার সাহস তার কখনো হয়নি। মিলন রাহাতকে জানালেন যে সেই ভাইরাল ভিডিও, যেটা রাহাতের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছিল, সেটা দুর্ঘটনাক্রমে ছড়ায়নি, বরং ফারুক সাহেব নিজে টাকা দিয়ে সেটা রেকর্ড করিয়ে ছড়িয়েছিলেন।

        মিলন আরও জানালেন, রাহাতকে জুয়ার আসরে আর নাইটক্লাবে নিয়মিত নিয়ে যাওয়া তার একদল বন্ধু আসলে ফারুক সাহেবের দ্বারা নিয়োজিত ছিল, তাদের প্রত্যেককে মাসিক ভাতা দেওয়া হতো রাহাতকে বিপথে রাখার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, রাহাত যত বেশি বিতর্কিত হবে, আফতাব চৌধুরীর ব্যবসায়িক সুনাম তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর সেই সুযোগে ফারুক সাহেব কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে পারবেন। মিলনের কাছে এই সব তথ্যের প্রমাণ হিসেবে পুরনো কিছু ব্যাংক লেনদেনের কাগজপত্র আর অডিও রেকর্ডিং ছিল, যা তিনি বছরের পর বছর গোপনে সংরক্ষণ করেছিলেন।

        এই সত্য জানার পর রাহাতের মনে জটিল অনুভূতির ঝড় বয়ে গেল। একদিকে সে বুঝল তার পতনের পেছনে শুধু তার নিজের দুর্বলতাই ছিল না, একটা সুপরিকল্পিত চক্রান্তও কাজ করেছিল। কিন্তু অন্যদিকে সে এটাও স্বীকার করল যে চক্রান্ত থাকলেও, মদ্যপান করা, জুয়া খেলা, বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করা, এই সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত তারই নেওয়া ছিল। কেউ তাকে জোর করে গ্লাস তুলে দেয়নি, সে নিজেই সেই পথ বেছে নিয়েছিল, যদিও চারপাশের পরিবেশ সেই পথে যাওয়া সহজ করে দিয়েছিল।

        রাহাত মিলনকে ধন্যবাদ জানাল সাহস করে সত্য বলার জন্য, আর সিদ্ধান্ত নিল এবার দেশে ফেরার সময় হয়েছে। এতদিনের জমানো অর্থ, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা, নতুন করে অর্জিত জ্ঞান, সব নিয়ে সে ফিরবে সেই বাড়িতে, যেখান থেকে একদিন তাকে খালি হাতে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তানিয়াকে সাথে নিয়ে, করিম চাচার আশীর্বাদ নিয়ে, রাহাত বিমানে চড়ল বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে, বুকের ভেতর মিশ্র অনুভূতি নিয়ে, একদিকে ভয়, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসানের আনন্দ।

        চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামার পর রাহাত প্রথমে সরাসরি বাড়িতে গেল না, বরং শহরে ঘুরে খোঁজখবর নিল কোম্পানির বর্তমান অবস্থা কী। যা জানল তা তার হৃদয় ভেঙে দিল। ফারুক সাহেব ধীরে ধীরে কোম্পানির অধিকাংশ শেয়ার নিজের নামে করে নিয়েছেন, আফতাব চৌধুরীকে কার্যত পরিচালনা পরিষদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, শুধু নামমাত্র উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়েছে। কারখানার অবস্থাও শোচনীয়, বেতন বকেয়া পড়ছে নিয়মিত, শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ।

        আফতাব চৌধুরীর সাথে দেখা করতে রাহাত সেই পুরনো বাড়িতে গেল, কিন্তু বাড়ির চেহারা বদলে গিয়েছিল, বাগান অযত্নে জঙ্গল হয়ে গিয়েছে, অনেক কাজের লোক ছাঁটাই হয়ে গিয়েছে খরচ বাঁচাতে। দরজায় কড়া নাড়তে মা নাজনিন বেগম দরজা খুললেন, প্রথমে চিনতে পারলেন না ছেলেকে, এত বছরের কষ্ট আর পরিশ্রমে রাহাতের চেহারায় এমন পরিবর্তন এসেছিল। যখন চিনতে পারলেন, তিনি চিৎকার করে কেঁদে ফেললেন, জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে, বহু বছরের জমে থাকা কান্না যেন একসাথে বেরিয়ে এলো।

        আফতাব চৌধুরী তখন অসুস্থ শয্যায়, হৃদরোগে ভুগছিলেন কয়েক বছর ধরে, ব্যবসার দুশ্চিন্তা তার শরীর আরও ভেঙে দিয়েছিল। ছেলেকে দেখে প্রথমে তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, ভাবছিলেন হয়তো স্বপ্ন দেখছেন। রাহাত বাবার পাশে বসে হাত ধরে বলল, বাবা আমি ফিরে এসেছি, আর কোথাও যাব না। আফতাব চৌধুরী কাঁপা কাঁপা হাতে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম, কিন্তু তারচেয়ে বড় ভুল ছিল তোমাকে ছোটবেলা থেকে সঠিক শিক্ষা না দেওয়া।

        রাহাত তখন মিলনের দেওয়া প্রমাণগুলো বাবার সামনে তুলে ধরল, ফারুক সাহেবের চক্রান্তের পুরো ইতিহাস খুলে বলল। আফতাব চৌধুরী প্রথমে বিশ্বাস করতে চাননি, এতদিনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক এত সহজে মিথ্যা হতে পারে ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল তার। কিন্তু ব্যাংক লেনদেনের নথি আর অডিও রেকর্ডিং শোনার পর তার আর সন্দেহ রইল না, বহু বছরের বিশ্বাসঘাতকতার পুরো চিত্র তার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

        রাহাত একটা আইনজীবীর দল নিয়োগ করল, প্রমাণগুলো আদালতে জমা দিল। মিলনও সাক্ষী হিসেবে এগিয়ে এলেন, আরও কয়েকজন সাবেক কর্মচারী যারা এতদিন ভয়ে চুপ ছিলেন, তারাও একে একে মুখ খুললেন। মামলা দীর্ঘ হলেও শেষ পর্যন্ত আদালত ফারুক সাহেবের বিরুদ্ধে জালিয়াতি আর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণিত বলে রায় দিলেন, তার অবৈধভাবে দখল করা শেয়ার বাতিল ঘোষণা করা হলো এবং কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ আবার আফতাব চৌধুরীর পরিবারের হাতে ফিরে এলো।

        আইনি লড়াই জেতার পর রাহাত কোম্পানির পুনর্গঠনের কাজে হাত দিল। ইতালিতে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সে কারখানার শ্রমিকদের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করল, যেখানে ন্যায্য মজুরি, নিয়মিত বেতন প্রদান, আর কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলো। সে ব্যক্তিগতভাবে কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের সাথে কথা বলত, তাদের সমস্যা শুনত, ঠিক যেমন একসময় নিজে শ্রমিক হিসেবে কষ্ট করেছিল বলে সে জানত এই অনুভূতির মূল্য কতটা।

        করিম চাচার সেই পুরনো দরখাস্তের কথা মনে করে রাহাত তাকে ইতালি থেকে ভিডিও কলে যুক্ত করল একটা অনুষ্ঠানে, যেখানে ঘোষণা দেওয়া হলো কারখানার প্রতিটা শ্রমিকের সন্তানের শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা হবে কোম্পানির পক্ষ থেকে। এই ঘোষণা শুনে কারখানার মেঝেতে বসে থাকা সেই নারী শ্রমিক, যিনি একসময় মেয়ের স্কুলের বেতনের জন্য কেঁদেছিলেন, আবার কাঁদলেন, তবে এবার আনন্দের অশ্রু।

        রাহাত তার ইতালির কোম্পানি বিও তেরা আর বাংলাদেশের চৌধুরী গ্রুপের মধ্যে একটা যৌথ উদ্যোগ শুরু করল, যেখানে বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য জৈব সার প্রযুক্তি আমদানি করা হলো এবং একইসাথে ইতালিতে বাংলাদেশ থেকে বৈধ পথে দক্ষ কৃষি শ্রমিক পাঠানোর একটা নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি করা হলো, সরকারি অনুমোদন নিয়ে, কোনো দালাল চক্রের মধ্যস্থতা ছাড়াই। এভাবে তার নিজের দুঃখজনক অভিজ্ঞতা রূপান্তরিত হলো শত শত মানুষের জন্য নিরাপদ সুযোগে।

        একদিন পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে আফতাব চৌধুরী সবার সামনে ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি একসময় ভেবেছিলাম আমার ছেলেকে সব দিয়ে দিলেই তাকে সুখী করা যাবে, কিন্তু আসল শিক্ষা তো জীবনই দেয়, আমার ছেলে সেই শিক্ষা কঠিনতম উপায়ে অর্জন করেছে, আজ আমি তাকে নিয়ে গর্বিত। এই কথাগুলো শুনে উপস্থিত সবার চোখে জল এসে গেল, রাহাত বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আপনার শাসনই আমাকে বাঁচিয়েছে বাবা, যদি আপনি সেদিন আমাকে বের করে না দিতেন, হয়তো আমি কখনো নিজেকে চিনতেই পারতাম না।

        কয়েক মাস পর জমকালো নয়, বরং একেবারে সাদাসিধে এক অনুষ্ঠানে রাহাত আর তানিয়ার বিয়ে হলো, যেখানে অতিথি হিসেবে ছিলেন করিম চাচা, জিউসেপ্পে, আর কারখানার সেই সব শ্রমিক যাদের জীবনে রাহাত পরিবর্তন এনেছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানে কোনো বিলাসিতা ছিল না, ছিল শুধু আন্তরিকতা, ঠিক যেমনটা রাহাত তার কঠিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছিল যে আসল সম্পদ হলো মানুষের ভালোবাসা, টাকা পয়সা নয়।

        আজ কয়েক বছর পর রাহাত চৌধুরী দুই দেশে ব্যবসা পরিচালনা করেন, একদিকে বাংলাদেশে বাবার হাত ধরে গড়া ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা, অন্যদিকে ইতালিতে নিজের হাতে গড়া বিও তেরা কোম্পানি। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বরং সেই ফাউন্ডেশন যেটা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার নাম দিয়েছেন নিরাপদ পথ, যার কাজ হলো অবৈধ অভিবাসনের বিপদ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং একইসাথে বৈধ ও নিরাপদ পথে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

        আজম মাতব্বরের বিরুদ্ধে করা মামলায় শেষ পর্যন্ত আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন, তার মানব পাচারের দীর্ঘ ইতিহাস প্রকাশ পেয়েছিল আদালতে, বহু ভুক্তভোগী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তার বিরুদ্ধে। এই রায় শুধু একজন দালালকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটা হাজারো পরিবারের জন্য একটা বার্তা বহন করেছিল যে অন্যায় শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে, বিচার দেরিতে হলেও আসে।

        করিম চাচা এখনও ইতালিতে ঘর আশ্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বে আছেন, প্রতি বছর শতাধিক নতুন অভিবাসীকে সাহায্য করেন নতুন জীবন শুরু করতে। জিউসেপ্পের খামার আজ পুরো অঞ্চলের মধ্যে একটা মডেল খামার হিসেবে পরিচিত, যেখানে দেশ বিদেশ থেকে মানুষ আসেন শিখতে কীভাবে ন্যায্য মজুরি আর টেকসই কৃষি একসাথে চলতে পারে। জসিম, যে একসময় দালালের হাতে প্রতারিত হয়ে এসেছিল, আজ বিও তেরা কোম্পানির একজন সফল ব্যবস্থাপক।

        আফতাব চৌধুরী আজও মাঝে মাঝে বলেন, জীবনে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ টাকা নয়, সময় আর মূল্যবোধ। তার এই কথাটা আজকাল তিনি নিজের নাতি নাতনিদের বলেন, কারণ রাহাত আর তানিয়ার সংসারেও এখন নতুন প্রজন্মের পদধ্বনি শোনা যায়। কিন্তু এবার রাহাত সতর্ক, সে জানে সন্তানকে সবকিছু দিয়ে দেওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি সন্তানকে জীবনের প্রকৃত মূল্য বোঝানো।

        মাঝে মাঝে রাহাত একা বসে সেই মরুভূমির রাতের কথা ভাবেন, সোহেলের কথা ভাবেন, যে পানির অভাবে প্রাণ হারিয়েছিল, হাসেম মিয়ার সেই অর্ধেক রুটির কথা ভাবেন। এই স্মৃতিগুলো তাকে কখনো ভুলতে দেয় না তার শিকড়ের কথা, ভুলতে দেয় না যে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলো আসে সবচেয়ে কঠিন সময়ে। রক্তে ভেজা সেই স্বপ্নের পথ পাড়ি দিয়ে আজ রাহাত চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন এক নতুন মানুষ হয়ে, যিনি জানেন প্রকৃত সম্পদ কাকে বলে, প্রকৃত সাফল্য কাকে বলে, আর সবচেয়ে বড় কথা, প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা কাকে বলে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ