১. টিউমার কী?
মানুষের শরীর কোটি কোটি কোষ দিয়ে তৈরি। স্বাভাবিক অবস্থায় কোষ নির্দিষ্ট নিয়মে তৈরি হয়, কাজ করে এবং পুরোনো হলে নষ্ট হয়। কোনো কারণে কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজনের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হলে অতিরিক্ত কোষ জমে অস্বাভাবিক টিস্যু বা গাঁট তৈরি হতে পারে—এটিই টিউমার।
টিউমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হতে পারে, যেমন:
মস্তিষ্ক
স্তন
ফুসফুস
লিভার
কিডনি
জরায়ু/ডিম্বাশয়
অন্ত্র
ত্বক
হাড়
প্রোস্টেট
পেশি ও অন্যান্য টিস্যু
২. টিউমার কত ধরনের?
ক) বিনাইন টিউমার
এটি সাধারণত ক্যানসার নয়।
বৈশিষ্ট্য:
সাধারণত ধীরে বৃদ্ধি পায়
শরীরের অন্য অংশে ছড়ায় না
অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ থাকে না
তবে বড় হলে আশপাশের অঙ্গ, রক্তনালি বা স্নায়ুর ওপর চাপ দিয়ে সমস্যা করতে পারে
অর্থাৎ বিনাইন মানেই সবসময় চিকিৎসার প্রয়োজন নেই—কোথায় এবং কত বড় হয়েছে তার ওপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করে।
খ) ম্যালিগন্যান্ট টিউমার
এটি ক্যানসারযুক্ত টিউমার।
এটি:
আশপাশের টিস্যুতে ঢুকে যেতে পারে
রক্ত বা লসিকানালির মাধ্যমে শরীরের অন্য অংশে ছড়াতে পারে
দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে
চিকিৎসা না করলে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে
৩. টিউমারের সাধারণ লক্ষণ
সব টিউমারের লক্ষণ একই নয়। টিউমার কোথায় হয়েছে তার ওপর লক্ষণ নির্ভর করে।
শরীরের বাইরে বা ত্বকের নিচে হলে
নতুন গাঁট দেখা দেওয়া
গাঁট ধীরে ধীরে বড় হওয়া
শক্ত বা অস্বাভাবিক অনুভূত হওয়া
কখনো ব্যথা থাকা
ত্বকের রঙ বা আকৃতিতে পরিবর্তন
মস্তিষ্কে হলে
বারবার বা ক্রমশ বাড়তে থাকা মাথাব্যথা
বমি
খিঁচুনি
দৃষ্টির সমস্যা
কথা বলতে সমস্যা
স্মৃতি বা আচরণে পরিবর্তন
শরীরের কোনো অংশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া
ফুসফুসে হলে
দীর্ঘদিনের কাশি
শ্বাসকষ্ট
বুকে ব্যথা
কাশির সঙ্গে রক্ত
বারবার ফুসফুসের সংক্রমণ
পেটে/অন্ত্রে হলে
দীর্ঘদিন পেটব্যথা
পেট ফুলে থাকা
ক্ষুধা কমে যাওয়া
পায়খানার অভ্যাসে পরিবর্তন
পায়খানায় রক্ত
বমি
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
স্তনে হলে
নতুন গাঁট
স্তনের আকৃতির পরিবর্তন
ত্বকে টান বা কুঁচকে যাওয়া
নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া
নিপল থেকে অস্বাভাবিক তরল বা রক্ত বের হওয়া
জরায়ু/ডিম্বাশয় অঞ্চলে হলে
অস্বাভাবিক যোনিপথে রক্তপাত
পেটের নিচে ব্যথা
পেট ফুলে যাওয়া
মাসিকের ধরনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
তবে এসব লক্ষণের অনেকগুলো সাধারণ ও ক্যানসারবিহীন রোগেও হতে পারে।
৪. টিউমার হওয়ার কারণ কী?
সব টিউমারের একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। কোষের DNA-তে পরিবর্তন বা জেনেটিক মিউটেশন টিউমার তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়াতে পারে:
বংশগত জেনেটিক পরিবর্তন
ধূমপান
অতিরিক্ত অ্যালকোহল
কিছু রাসায়নিক পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ
অতিরিক্ত সূর্যের UV রশ্মি
কিছু ভাইরাস/সংক্রমণ
অতিরিক্ত ওজন ও কিছু জীবনযাপনজনিত কারণ
বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু টিউমারের ঝুঁকি বৃদ্ধি
তবে টিউমার হয়েছে মানেই রোগীর কোনো ভুলের কারণে হয়েছে—এমন নয়।
৫. টিউমার কি উপকারী?
সাধারণ অর্থে টিউমারকে শরীরের জন্য উপকারী বলা হয় না।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
সব টিউমার ক্ষতিকর নয়।
একটি ছোট বিনাইন টিউমার যদি গুরুত্বপূর্ণ কোনো অঙ্গে চাপ না দেয় এবং কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে, চিকিৎসক কখনো কখনো শুধু নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
অন্যদিকে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার শরীরের জন্য ক্ষতিকর এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
৬. টিউমার কী কী ক্ষতি করতে পারে?
টিউমারের কারণে হতে পারে:
ব্যথা
রক্তপাত
কোনো অঙ্গের ওপর চাপ
অঙ্গের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হওয়া
স্নায়ুর ওপর চাপ
শ্বাসকষ্ট
হজমের সমস্যা
প্রস্রাব বা পায়খানায় সমস্যা
দুর্বলতা
ওজন কমে যাওয়া
ক্যানসারযুক্ত টিউমার শরীরের অন্য জায়গায় ছড়ালে তাকে মেটাস্টেসিস বলা হয়। এটি রোগকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
৭. টিউমার কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
প্রথমে চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়।
ইমেজিং পরীক্ষা
আল্ট্রাসনোগ্রাম
এক্স-রে
CT scan
MRI
PET scan—নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে
এগুলো টিউমারের অবস্থান, আকার ও আশপাশের অবস্থার ধারণা দিতে পারে।
বায়োপসি
অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো বায়োপসি।
এতে টিউমার থেকে সামান্য টিস্যু নিয়ে পরীক্ষাগারে মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়।
এর মাধ্যমে বোঝা যেতে পারে:
টিউমারটি ক্যানসার কি না
কী ধরনের ক্যানসার
কোষের বৈশিষ্ট্য কী
সব টিউমারের ক্ষেত্রে একই ধরনের পরীক্ষা বা বায়োপসি প্রয়োজন হয় না।
৮. টিউমারের চিকিৎসা কী?
চিকিৎসা নির্ভর করে:
টিউমার বিনাইন না ম্যালিগন্যান্ট
কোথায় হয়েছে
কত বড়
কত দ্রুত বাড়ছে
ক্যানসার হলে কোন পর্যায়ে আছে
রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য
টিউমারের নির্দিষ্ট কোষগত বৈশিষ্ট্য
১. পর্যবেক্ষণ
ছোট ও কম ঝুঁকির কিছু বিনাইন টিউমারের ক্ষেত্রে চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
২. অস্ত্রোপচার
টিউমার যদি অপারেশনের মাধ্যমে নিরাপদে সরানো সম্ভব হয়, অস্ত্রোপচার করা হতে পারে।
৩. কেমোথেরাপি
ক্যানসার কোষ ধ্বংস বা তাদের বৃদ্ধি কমানোর জন্য বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
৪. রেডিয়েশন থেরাপি
উচ্চ-শক্তির রশ্মি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষ ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
৫. টার্গেটেড থেরাপি
ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে লক্ষ্য করে ওষুধ দেওয়া হয়।
৬. ইমিউনোথেরাপি
কিছু ক্যানসারে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে কাজ করতে সাহায্য করা হয়।
৭. হরমোন থেরাপি
কিছু হরমোন-নির্ভর ক্যানসারের ক্ষেত্রে হরমোনের প্রভাব কমানোর চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়।
একজন রোগীর ক্ষেত্রে একাধিক চিকিৎসা একসঙ্গে বা পর্যায়ক্রমে লাগতে পারে।
৯. টিউমারের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আলাদা।
কেমোথেরাপিতে যেমন হতে পারে:
বমি বমি ভাব
দুর্বলতা
ক্ষুধা কমে যাওয়া
চুল পড়া
রক্তের কোষ কমে যাওয়া
সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি
রেডিয়েশন থেরাপিতে:
চিকিৎসার স্থানে ত্বকের পরিবর্তন
ক্লান্তি
অবস্থানভেদে অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
তবে প্রত্যেক রোগীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া একই হয় না।
১০. কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
নিচের কোনো সমস্যা থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
নতুন গাঁট তৈরি হয়ে ক্রমশ বড় হচ্ছে
গাঁটের সঙ্গে অস্বাভাবিক রক্তপাত
কাশির সঙ্গে রক্ত
পায়খানায় রক্ত
অকারণে দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
দীর্ঘদিনের অজানা ব্যথা
বারবার খিঁচুনি
শরীরের কোনো অংশ হঠাৎ দুর্বল/অবশ হওয়া
শ্বাস নিতে গুরুতর সমস্যা
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
১১. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
“টিউমার” শব্দটি শুনেই ক্যানসার ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবার কোনো গাঁটকে পরীক্ষা না করে “নিরীহ” মনে করাও ঠিক নয়।
সঠিকভাবে জানতে সাধারণত চিকিৎসকের মূল্যায়ন + প্রয়োজনীয় ইমেজিং + কখনো বায়োপসি/প্যাথলজি দরকার হয়।

0 মন্তব্যসমূহ
কেমন লাগলো বা আপনার মতামত কমেন্ট করে জানান। গঠনমূলক যেকোনো মন্তব্য ও পরামর্শ সাদরে গ্রহণযোগ্য!