শেষ চৌকাঠ (পর্ব-৮)

শেষ চৌকাঠ - পর্ব ৮: মহাকাব্যিক সমাপনী | নাহিদ আমিন
সূর্যাস্তের আলোয় একলা দাঁড়িয়ে থাকা গৃহের চৌকাঠ

শেষ চৌকাঠ

লেখক: নাহিদ আমিন
পর্ব–৮ (শেষ পর্ব)

মহাকাব্যিক সমাপনী

"চৌকাঠ পেরিয়ে যারা চলে যায়, তারা ভেবেছিল আলো শুধুই তাদের সাথে গেছে; তারা বোঝেনি, ঘরের যে মোমবাতিটি গলে শেষ হয়েছিল—আলোর প্রকৃত উৎস ছিল সে-ই..."

সময় ও নিয়তি বড় অদ্ভুত এক চিত্রনাট্য তৈরি করে। কয়েক বছরের মধ্যে ঘটনাচক্রে অহংকারী তিন ভাইয়ের জীবনে নেমে এলো ভয়াবহ বিপর্যয়। বিদেশে আনাসের ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামল, ভুল চালানে দেউলিয়া হয়ে তাকে নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরে আসতে হলো। আকবরের ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতির মামলায় তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হলো এবং স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদ ঘটল। অন্যদিকে, ডাক্তার আয়াস ভুল চিকিৎসা ও হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ দলাদলির কারণে লাইসেন্স হারিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত শ্বশুরবাড়ির চরম লাঞ্ছনার শিকার হয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হলো। যে প্রতিপত্তি আর অহংকারের জোরে তারা তাদের পঙ্গু বড় ভাই আর বৃদ্ধ মা-বাবাকে পর করে দিয়েছিল, সেই ধনের মোহ আজ ধুলোয় মিশে গেছে। নিঃস্ব, লজ্জিত ও গৃহহীন অবস্থায় তিন ভাই অনুশোচনার আগুনে পুড়তে পুড়তে শেষমেশ ঢাকার পথে পথে ঘুরতে লাগল।

ঠিক একই সময়ে ঢাকার বড় মিলনায়তনে উদযাপিত হচ্ছিল এক জাতীয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। জাতীয় পর্যায়ে সফল নারী উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিবিদ হিসেবে পদক পাচ্ছেন শ্রাবণী আমিন। মঞ্চের আলো যখন শ্রাবণীর ওপর এসে পড়ল, তখন শত শত গণ্যমান্য মানুষ করতালিতে মুখরিত করে তুলল চারপাশ। পদক হাতে নেওয়ার পর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রাবণী কোনো অহংকার প্রকাশ করল না। সে এক গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, "আজকের এই পদক আমার নয়। এই পদক আমার সেই বাবার, যিনি নিজের যৌবনের সমস্ত স্বপ্নকে বাসের স্টিয়ারিংয়ের সাথে সঁপে দিয়ে ছোট ভাইবোনদের মানুষ করেছিলেন। যিনি নিজে পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে থেকেও আমাদের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হতে দেননি। আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তা আমার পঙ্গু বাবার রক্তজল করা শ্রমের ভিত্তিপ্রস্তর।" টিভি স্ক্রিনে সরাসরি সম্প্রচারিত এই কথাগুলো যখন প্রচারিত হচ্ছিল, তখন রাস্তার টং দোকানে দাঁড়িয়ে তিন নিঃস্ব ভাই তা দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

সেই সন্ধ্যায় শ্রাবণীর নতুন সুসজ্জিত বাড়ির সামনের উঠোনে এক বিষাদময় নীরবতা নেমে এসেছিল। হুইলচেয়ারে বসে বিকেলের শেষ আলোটুকুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন বৃদ্ধ আরাফ। পাশেই রিজিয়া ও ছেলে আলিফ দাঁড়িয়েছিল। ঠিক তখনই বাড়ির সামনের লোহার গেট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল তিনটি অপরাধী মানবমূর্তি। ধুলোবালি মাখা জামা, চোখের নিচে গভীর কালি আর মাথানত করে দাঁড়িয়ে ছিল আয়াস, আনাস ও আকবর। তারা এতদিন যে বড় ভাইকে অশিক্ষিত ড্রাইভার বলে লজ্জা পেত, আজ সেই বড় ভাইয়ের নতুন বাড়ির উঠোনে এসে থরথর করে কাঁপছিল। আয়াস হাঁটু গেড়ে বসে আরাফের পঙ্গু পা দুটো জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। "আমারে মাফ কইরা দাও বড় ভাই... আমরা পাষাণ, আমরা অন্ধ হইয়া গেছিলাম! বাবা-মারে অবহেলা করছি, তোমারে অপমান করছি... ভগবান আজ আমগো রাস্তায় নামাইয়া দিছে ভাই!"

"সংসারের যে বটবৃক্ষটি ডালপালা ছেঁটে ফেলেও শিকড় দিয়ে বাকিদের আঁকড়ে রাখতে চায়, শেষ বয়সে তার পরম ক্ষমার চেয়ে বড় কোনো আশ্রয় এই পৃথিবীতে হতে পারে না।"

শ্রাবণী ও আলিফ রাগ ও ক্ষোভে এগিয়ে এসে তাদের তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। শ্রাবণী কড়া গলায় বলল, "যেই চাচারা আমার বাবার চিকিৎসার এক টাকা দেয় নাই, দাদাজানের কাফনের টাকার জন্য হিসাব কষছে—আজ তাদের এই দরজায় পা দেওয়ার কোনো অধিকার নাই!" কিন্তু হুইলচেয়ার থেকে আরাফ তার জীর্ণ ও দুর্বল হাতটি তুলে মেয়েকে থামাল। তার চোখে কোনো রাগের চিহ্ন ছিল না; ছিল কেবল এক অনন্ত মহাসমুদ্রের মতো করুণা ও ভালোবাসা। আরাফ বহু কষ্টে নিচু হয়ে তার পঙ্গু হাত দুটো দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা ছোট ভাইদের মাথা ছুঁয়ে দিল। তার গলার স্বর বুজে আসছিল, "কান্দিস না আয়াস... তোরা তো আমারই রক্তের ছোট ভাই রে। তোদের গায়ে যখন কষ্ট লেগেছে, এই বড় ভাইয়ের বুকেও টান পড়েছে। তোদের পরম আশ্রয় এই ঘরেই আছে।"

আরাফ তিন ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। যে রক্তের বন্ধন স্বার্থের ঝড়ে ছিন্ন হতে বসেছিল, আজ তা বড় ভাইয়ের এক ফোঁটা চোখের জলে আবার শক্ত হয়ে জোড়া লেগে গেল। শ্রাবণী ও রিজিয়া নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিল। সন্ধ্যা পেরিয়ে আকাশে তখন জোৎস্নার আলো ফুটতে শুরু করেছে। আরাফ ধীরে ধীরে হুইলচেয়ারটি ঘুরিয়ে বাড়ির মূল দরজার ‘শেষ চৌকাঠ’-এর দিকে তাকাল। যে চৌকাঠ একদিন দারিদ্র্য, অপমান আর অশ্রুতে ভেজা ছিল—আজ সেই চৌকাঠ দাঁড়িয়ে আছে ত্যাগ, ভালবাসা আর পরম ক্ষমার এক অমর প্রতীক হয়ে। আরাফ মনে মনে তার প্রয়াত বাবা জয়নাল ও মা সখিনাকে স্মরণ করল। সে তার জীবনের দায়িত্ব পূর্ণ করেছে; নিজের জীবন নিংড়ে হলেও সে তার সংসারকে ভেঙে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে এক ছাদের নিচে ফিরিয়ে এনেছে।

বাতাসে ভেসে আসা হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় আরাফের চোখ দুটো আস্তে আস্তে বুজে এলো। তার মুখে ফুটে উঠেছিল এক স্বর্গীয় তৃপ্তির হাসি। জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, ব্যথা আর রক্তক্ষরণের সমাপ্তি ঘটিয়ে সে আজ এক পরম শান্তিতে বিশ্রাম নিল। আর পেছনে ফেলে গেল এক মহাকাব্যিক রূপকথা—যেখানে ত্যাগ কখনো পরাজিত হয় না, আর ভালোবাসাই জীবনের শেষ চৌকাঠ রক্ষা করে।

- সমাপ্ত -

"শেষ চৌকাঠ" উপন্যাসের সাথে থাকার জন্য সকল পাঠককে আন্তরিক ধন্যবাদ। রক্ত ও ত্যাগের এই গল্প আমাদের শেখায়—স্বার্থ নয়, ক্ষমাই হলো ভালোবাসার পরম প্রকাশ।

উপন্যাস সম্পর্কিত তথ্য

‘শেষ চৌকাঠ’ হলো নাহিদ আমিনের একটি সম্পূর্ণ জীবনধর্মী পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। উপন্যাসটির সমস্ত স্বত্ব সংরক্ষিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ